
সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’। দেশের কৃষি খাতকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প নেওয়া হলেও, তা এখন পরিণত হয়েছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি)-র ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে। পিডির সীমাহীন দুর্নীতি, কাগুজে উন্নয়ন, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং সিন্ডিকেট বাণিজ্যের মাধ্যমে সরকারের বিপুল অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। কৃষি বিভাগে এখন তাকে নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা, অনেকেই পর্দার আড়ালে তাকে ডাকছেন নতুন এক ‘গুপ্ত শফিক’ নামে।
ভুয়া কৃষক ও প্রদর্শনী খামারের নামে লোপাট
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে ডাল ও তেলবীজের উৎপাদন বাড়াতে বিনামূল্যে বীজ, সার এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি বিতরণের কথা থাকলেও তার সিংহভাগই গেছে কাগজে-কলমে। ভুয়া কৃষকের তালিকা তৈরি করে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন পিডি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব ‘প্রদর্শনী খামার’ দেখিয়ে বিল তোলা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে ভুয়া ভাউচারে স্বাক্ষর করিয়ে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উচ্চমূল্যে নিম্নমানের বীজ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়
প্রকল্পের আওতায় মানসম্মত বীজ ক্রয়ের নামে পিডি নিজের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন। বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে নিম্নমানের বীজ কিনে কৃষকদের সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় বীজ বপনের পরও কাঙ্ক্ষিত ফলন আসেনি, যা দেশের তেল ও ডাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এছাড়া আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ওভার-ইনভয়েসিং বা বাড়তি মূল্য দেখিয়ে সরকারি তহবিল খালি করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের নামে ‘কাগুজে উৎসব’
কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বরাবরের মতোই হরিলুট হয়েছে। পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের কথা বলে মাত্র একবেলার লোকদেখানো অনুষ্ঠান করে পুরো টাকা পকেটে পুরেছে পিডির সিন্ডিকেট। অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভুয়া উপস্থিতি তালিকা ও ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। যাতায়াত ভাতা (টিএ/ডিএ) বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কর্মকর্তাদের নামে উত্তোলন করা হলেও মাঠপর্যায়ের প্রকৃত কর্মকর্তারা এর কিছুই জানেন না।
বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট রাজত্ব
নিজস্ব এই দুর্নীতি সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে পিডি কৃষি বিভাগের ভেতরে এক অদৃশ্য রাজত্ব কায়েম করেছেন। যেসব কর্মকর্তা তার এই অনৈতিক ফাইলে সই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদেরই দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকায় শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, তার দুর্নীতিতে সহযোগিতাকারীদের দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই ক্ষমতার দাপট ও ধরাকে সরা জ্ঞান করার কারণেই তাকে সাবেক কুখ্যাত দুর্নীতিবাজদের সাথে তুলনা করে ‘গুপ্ত শফিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ঊর্ধ্বতন মহলের রহস্যজনক নীরবতা
ডাল ও তেলবীজ প্রকল্পের এই হরিলুট নিয়ে একাধিকবার অডিট আপত্তি এবং অভিযোগ জমা পড়লেও পিডির বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে পিডির গোপন আর্থিক লেনদেন ও লিয়াজোঁ থাকার কারণেই তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে ৪ আগস্ট ২০২৪ এ মানিক মিয়া এভিনিউতে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য মাঠে নেমেছিলেন প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। আজকে ক্ষমতার পালাবদলে নিজেকে বদলে ফেলেছেন তিনি। একসময়ের দাপুটে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তা এখন নিজেকে ছাত্রদল করা ত্যাগী ও বঞ্চিত হিসেবে নিজেকে জাহির করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। শুধু তাই নয় বর্তমানে এই গুপ্ত শফিক বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির চেয়ারম্যান সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজেকে বিএনপির আদর্শে গড়া কর্মী হিসেবে জাহির করতে চাইলেও তার কাজকর্মে এখনো ফ্যাসিস্টের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ দেয়ার জন্য তার প্রথম পছন্দ আওয়ামী ঘরানার লোকজন। সম্প্রতি তার প্রকল্পের একটি টেন্ডারে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চেয়ে মনগড়া বিজ্ঞপ্তি তিনি দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার জানান, ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া মানেই আওয়ামিলীগ পন্থী ঠিকাদারদের কাজ দেয়ার একটি পায়তারা। কারন বিগত ১৫ বছরে তো বিএনপির কোন কর্মী কাজ তো দূরের কথা বিএডিসি ভবনেই ঢুকতে পারেননি। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারদের কাছ থেকে উপর মহল ম্যানেজ করার নামে অনেক টাকা পয়সা নেয়ার পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে কৃষিবান্ধব প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিলেন তার ছিটেফোঁটা ও বাস্তবায়ন হচ্ছে না শুধুমাত্র গুপ্ত শফিক মার্কা পিডির কারনে। বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করলে আরও অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অভিজ্ঞমহল বলতে চান। তিনি এতোই চতুর যে টাকা পয়সা লেনদেনের সুবিধার্থে গুটিকয়েক নিজস্ব ঠিকাদার ছাড়া অন্য কাউকে কাজই দেন না। যার ফলে তার এই টেন্ডার বানিজ্যের কথা অজানাই রয়ে যায়।
একই অঙ্গে বহু রূপ
অতি সম্প্রতি বিএডিসির প্রকৌশলীদের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে প্রভাব বিস্তার করা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম নির্বাচন করেছেন বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল জামায়াতে ইসলামী থেকে। বহুরূপী শফিকুল ইসলামের একই অঙ্গে যে কত রূপ তা দেখতে হলে আরও অপেক্ষা করতে হবে। ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় আসলে তিনি নিজেকে জামায়াতের একনিষ্ঠ কর্মী পরিচয় দিতেও পিছপা হবেন না বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে।
দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের এই মহাপরিকল্পনাকে যারা নিজেদের পকেট ভারী করার হাতিয়ার বানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার বার্তা/এমই

