
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত “নিরাপদ কর্মপরিবেশ: সবাই মিলে সবার জন্য” শীর্ষক সেমিনারে এই আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে বিলস-এর ‘বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মক্ষেত্র পরিস্থিতি’ শীর্ষক জরিপ-২০২৫ এবং জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬-এর তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে মোট ৭৩৫ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
বিলস পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়কালে কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনায় যে ১৮৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে ১৮৫ জন পুরুষ এবং ১ জন নারী শ্রমিক। সর্বোচ্চ ১০৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। এ ছাড়াও কৃষি খাতে ১৯ জন, নির্মাণ খাতে ১৪ জন, প্রবাসী শ্রমিক ১১ জন, দিনমজুর ১১ জন, মৎস্য খাতে ৯ জন, বিদ্যুৎ খাতে ৬ জন এবং অন্যান্য খাতে ৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৩৩৫ জন শ্রমিক আহত হন, যার মধ্যে ৩১৯ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী শ্রমিক। সর্বোচ্চ পোশাক খাতে ২৫০ জন শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া ১২ জন ওয়ার্কশপ শ্রমিক, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, ৯ জন মৎস্য শ্রমিক, ৯ জন পাদুকাশিল্প শ্রমিক, ৮ জন স্টিল মিল শ্রমিক, ৭ জন নির্মাণ শ্রমিক ও ৭ জন হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া অন্যান্য খাতে ২৩ জন শ্রমিক আহত হন।
২০২৫ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় যে ৭৩৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে ৭৩১ জন পুরুষ এবং ৪ জন নারী শ্রমিক। খাত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ৪৩৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় পরিবহন খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় কৃষি খাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় নির্মাণ খাতে। এ ছাড়া মৎস্য শ্রমিক ৩৫ জন, দিনমজুর ৩২ জন, বিদ্যুৎ খাতে ১৫ জন, প্রবাসী শ্রমিক ১২ জন, নৌ-পরিবহন খাতে ১১ জন, তৈরি পোশাক খাতে ৬ জন, টেক্সটাইল খাতে ৪ জন এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পে ৪ জনসহ অন্যান্য খাতে ৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ইস্যুতে কিছুটা অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতে ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তায় উন্নয়ন, শ্রম আইন সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি বৃদ্ধি পেলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের অধিকাংশ শ্রমিক এখনো নিরাপত্তা সুরক্ষার বাইরে। এ ছাড়া কার্যকর সেফটি কমিটির অভাব, সীমিত পরিদর্শন ব্যবস্থা, নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি এবং মনোসামাজিক ঝুঁকির বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত।
বিজ্ঞাপন
তারা বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নীতি সংস্কার ও বাস্তবায়নে গতি আনা সম্ভব। অংশগ্রহণকারীরা শ্রম আইন বাস্তবায়ন জোরদার, পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিলসের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভুঞাঁ, নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ, ওয়ার্কিং কন্ডিশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নিরান রামজুথান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম-মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া ও মো. মতিউর রহমান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আলী আহাম্মেদ খান, ঢাকা দক্ষিণের জোন কমান্ডার ফয়সালুর রহমান এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
আমার বার্তা/এমই

