
নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে দুই দফা পিছিয়ে পড়লেও একটুও হাল ছাড়ল না কেপ ভার্দে। ঘুরে দাঁড়িয়ে এবারের বিশ্বকাপের নবাগত দলটি আরও একবার চমক দেখিয়ে ঘাম ছাড়িয়ে ছাড়ল আর্জেন্টিনার। তবে শেষ পর্যন্ত চরম বাধা অতিক্রম করে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা— আত্মঘাতী গোলের কল্যাণে।
শনিবার সকালে মায়ামিতে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শেষ বত্রিশের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর আগে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয় ১-১ সমতায়।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে মহাতারকা লিওনেল মেসির গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে দেরয় দুয়ার্তের লক্ষ্যভেদে সমতা টানে কেপ ভার্দে। এরপর অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের শুরুতেই লিসান্দ্রো মার্তিনেজের কল্যাণে আর্জেন্টিনা ফের লিড নেওয়ার পর শেষদিকে স্কোরলাইন ২-২ করেন সিডনি লোপেস কাবরাল। খেলা যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ম্যাচের ১১১তম মিনিটে ডিনি বোর্জেসের আত্মঘাতী গোল গড়ে দেয় ব্যবধান।
এই জয়ে আসরের শেষ ষোলোতে নাম লিখিয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা, যেখানে তাদের অপেক্ষায় আছে মিশর। অন্যদিকে, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও প্রতিপক্ষের সমীহ ও ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে মর্যাদা— দুটিই আদায় করে নিয়েছে কেপ ভার্দে। এর আগে গ্রুপ পর্বে তারা ছিল অপরাজিত। তিনটি ম্যাচই ড্র করেছিল যথাক্রমে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে।
গোটা ম্যাচে ৬৪ শতাংশ সময় বল দখলে রাখা আর্জেন্টিনা গোলমুখে ২২টি শট নিয়ে লক্ষ্য রাখে ১০টি। বিপরীতে, গোলপোস্টে কেপ ভার্দের ১৬টি শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।
বেশ ঢিমেতালে শুরু হওয়া ম্যাচের ১৫তম মিনিটে প্রথমবারের মতো কোনো দল গোলমুখে শট নেয়। ডি-বক্সের বামদিক থেকে নেওয়া ৩৯ বছর বয়সী মেসির নেওয়া কোণাকুণি শট চলে যায় পোস্টের বাইরে দিয়ে। তিন মিনিট পর ফ্রি-কিক থেকে সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। তবে মেসির দূরপাল্লার শট আটকাতে কোনো বেগ পেতে হয়নি গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে।
মেসির আরেকটি গোলে অবশেষে অচলাবস্থা ভাঙে ২৯তম মিনিটে। সেন্টার ব্যাক লিসান্দ্রো মাঝমাঠের সামনে থেকে উঁচু করে অসাধারণ একটি নিখুঁত পাস বাড়ান কেপ ভার্দের ডি-বক্সে। বল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলতো ও চোখ ধাঁধানো স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। এরপর চিরাচরিত বাম পায়ের শটে ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করে বল পাঠিয়ে দেন জালে।
বিশ্বকাপে রেকর্ড ৩০তম ম্যাচ খেলতে নামা আর্জেন্টিনার অধিনায়ক মেসির এবারের আসরে এটি সপ্তম গোল, যিনি আছেন গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে। সব মিলিয়ে ফুটবলের মহাযজ্ঞে তার গোল হলো ২০টি। বিশ্বকাপে গোলের সংখ্যা বিশের ঘর ছোঁয়া প্রথম খেলোয়াড় তিনি।
বিরতির আগে আবার ভোজিনিয়াকে পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। এই দফায় ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে মিডফিল্ডার এঞ্জো ফার্নান্দেজের শট ঝাঁপিয়ে রক্ষা করে ব্যবধান বাড়তে দেননি তিনি।
প্রথমার্ধে কেপ ভার্দে কয়েকবার আভাস দিলেও বলার মতো কোনো আক্রমণ শানাতে পারেনি। তাই গোলপোস্টের নিচে অলস সময় কাটাতে হয় আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে।
বিরতির পর কেপ ভার্দেকে দেখা যায় অন্য রূপে। আক্রমণে মনোযোগী হওয়ার সুফল হিসেবে গোলও পেয়ে যায় তারা। ৫২তম মিনিটে দেরয়ের শট ঠেকালেও সাত মিনিট পর আর পারেননি এমিলিয়ানো। রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাকে নিচু কোণাকুণি শটে নিশানা ভেদ করেন মিডফিল্ডার দেরয়।
গোল হজমের পর গা ঝাড়া দেয় আলবিসেলেস্তেরা। ৬২তম মিনিটে লাউতারো মার্তিনেজের ফ্লিকে বল পেয়ে ডি-বক্সে ভোজিনিয়াকে একা পেলেও সোজাসুজি তার গায়ে মেরে সুযোগ হারান মেসি। ১০ মিনিট পর আবার বাধা হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের গোলরক্ষক। এবার মেসির দ্রুত নেওয়া ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন তিনি। ওই কর্নার থেকে বদলি নামা মিডফিল্ডার নিকো গঞ্জালেজের হেড থাকেনি লক্ষ্যে।
যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আরেক বদলি মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো পারেদেসের দূরপাল্লার শট সহজেই লুফে নেন ভোজিনিয়া। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগেও তিনি দেখান বীরত্ব। মেসির ফ্রি-কিক সিডনির পায়ে লেগে দিক পাল্টালেও ভোজিনিয়া ফিরিয়ে দেন বল।
ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। দ্বিতীয় মিনিটেই গোল পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির কর্নারে আলেক্সিস মাক আলিস্তার হেড করার পর দূরের পোস্টে বল পান লিসান্দ্রো। প্রথম ছোঁয়ায় জায়গা বানিয়ে বাম পায়ের বুলেট গতির শটে জাল কাঁপান তিনি।
তবে ম্যাচের নাটকীয়তার বাকি তখনও অনেক। মোড় আবার ঘুরে যায় লেফট ব্যাক সিডনির চোখ ধাঁধানো গোলে। ১০৩তম মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে বাম দিক থেকে মাক আলিস্তারের চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে সামনে এগিয়ে তিনি নেন বাঁকানো শট। বল ঠেকানোর কোনো উপায়ই ছিল না এমিলিয়ানোর— ফের সমতা।
যোগ করা সময়ে মেসিকে আবারও হতাশ করেন ভোজিনিয়া। তবে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে আর পারেননি তিনি। মেসির কর্নারে সেন্টার ব্যাক ক্রিস্তিয়ান রোমেরো হেড করার পর বল বোর্জেসের হাতে লেগে জালে জড়ায়।
তৃতীয় দফা এগিয়ে যাওয়ার পরও আর্জেন্টিনা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ১১৬তম মিনিটে সিডনির দারুণ ফ্রি-কিক ঝাঁপিয়ে রুখে দেন এমিলিয়ানো। তিন মিনিট পর আবার মঞ্চে আবির্ভূত হতে হয় তাকে। স্টিভেন মোরেইরার ক্রসে কেপ ভার্দের একজন হেড করে বিপজ্জনক জায়গায় ফেলেন। তবে বদলি নামা স্ট্রাইকার গিলসন বেনচিমল পা ছোঁয়ানোর আগেই পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে কর্নারের বিনিময়ে বল রুখে দেন এমিলিয়ানো।
কিছুক্ষণ পরই বেজে ওঠে রেফারির শেষ বাঁশি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম অবস্থানে থাকা কেপ ভার্দেকে হারিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শীর্ষস্থানধারী আর্জেন্টিনা। আটলান্টায় আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় তারা মুখোমুখি হবে মিশরের।
আমার বার্তা /জেএইচ

