
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। যা আগামীকাল বুধবার (১ জুলাই) থেকে নতুন বাজেট কার্যকর হবে। নতুন বাজেটে কর, ভ্যাট ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস করা হয়।
এর আগে গতকাল (সোমবার) কয়েকটি সংশোধনীসহ অর্থবিল পাস করে জাতীয় সংসদ। সংশোধিত অর্থবিলে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের করপোরেট কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবও বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থবিল পাসের মধ্য দিয়ে কর ও শুল্কসংক্রান্ত সব প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়েছে।
গতকাল সোমবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে, গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নির্দিষ্টকরণ আইন ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অনুকূলে বরাদ্দ দিয়ে মঞ্জুরি দাবি পাস করা হয়। ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সদস্যরা ১৩৪৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব প্রদান করেন। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনা করে তা নামঞ্জুর করা হয়। পরে সময় বাঁচানোর জন্য বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নিলে মঞ্জুরিগুলো দ্রুত পাস করা হয়।
নির্দিষ্টকরণ বিলের মাধ্যমে পাস হলো নতুন বছরের বাজেট
নিদিষ্টকরণ বিলে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য ব্যয় নির্বাহে রাষ্ট্রপতিকে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকার অনধিক পরিমাণ অর্থ সংযুক্ত তহবিল হতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তার মধ্যে সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়, গৃহীত হয় ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪১৪ কোটি ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, বাকি ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় হিসেবে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্টকরণ বিল উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অন্যান্য মঞ্জুরি দাবিগুলো উত্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। আর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন। এর আগে গত সোমবার বেশকিছু সংশোধনী এনে অর্থ বিল ২০২৬ পাস করা হয়।
গত বছরের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেড়েছে বাজেট
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ। বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো যা বরাদ্দ পেল
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জন্য বরাদ্দগুলো হলো— রাষ্ট্রপতির কার্যালয় : ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, জাতীয় সংসদ : ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় : ৩,৮৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ : ১০৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট : ২৯১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় : ৪,৪০০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় : ৫,০৬৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন : ১৩৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, অর্থ বিভাগ : ৮,৩০,৫৫১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় : ৩৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ : ৪,৬৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ : ৩,৫৬৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ : ৬৯,২৪৮ কোটি ৯০ লাখ ৬২ হাজার টাকা, পরিকল্পনা বিভাগ : ৩৬,২৫১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ : ২৩১ কোটি টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ : ৬৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা,
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় : ৩২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : ১,৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় : ৪২,৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ : ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, আইন ও বিচার বিভাগ : ২,১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : ৩১,০৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ : ৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় : ৪৬,৭৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ : ৫৭,৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় : ১৮,১১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ : ৪৯,৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ : ২,০৪৯ কোটি ২ লাখ টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় : ৩০,৪৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫,১৯৬ কোটি ১৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় : ৪৬৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা,
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় : ৫,০৭৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় : ১,১৮৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় : ৮২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় : ২,৯৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় : ২,৫৮৬ কোটি ৬ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগ : ৪০,২৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ : ১,১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয় : ১,৬৯১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় : ৮৭৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় : ৫১১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ : ২,৩৮৯ কোটি ২ লাখ টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয় : ২৮,৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় : ২,৭২৭ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার টাকা,
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় : ২,২৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয় : ২,৪৩৯ কোটি ৪৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় : ১০,৫৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয় : ৩২,৪১৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় : ১০,৩৪৯ কোটি ৫৮ লাখ ৭ হাজার টাকা, পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ: ৩৬,৯১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয় : ৯৯৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, নৌ পরিবহন ৯,০৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় : ১,৮৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ : ২,১৪১ কোটি ২২ লাখ টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় : ১,৪৫৭ কোটি ৮২ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ : ১৪,৯৯৬ কোটি ২ লাখ টাকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় : ৭,৫১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, দুর্নীতি দমন কমিশন : ১৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, সেতু বিভাগ : ২,৯০৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ : ১৮,৪৫৭ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ : ১৩,৪৬৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
আমার বার্তা/এমই

