
কিছু মানুষের জীবনকে শুধু জীবনী বলা যায় না। জীবনীতে জন্মতারিখ থাকে, শিক্ষার বিবরণ থাকে, চাকরি থাকে, পদ-পদবি থাকে। কিন্তু মানুষের আসল জীবন লেখা থাকে অন্য জায়গায়—সে কতবার ভেঙেছে, কতবার উঠে দাঁড়িয়েছে, কতটা অন্ধকার পেরিয়েছে এবং সেই অন্ধকারের মধ্যেও তার ভেতরের আলোটুকু বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে কি না।
সালাহউদ্দিন আহমদ তেমন একজন মানুষ।
তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চার দশকের রাজনীতির অনেকগুলো দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আইনজীবী, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব, সরকারি চাকরি ছেড়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে আসা তরুণ নেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, কক্সবাজারের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন জনপ্রতিনিধি, বিএনপির মুখপাত্র, কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতা, গুমের শিকার মানুষ, শিলংয়ের নির্বাসিত নাগরিক, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য—সবশেষে জনগণের ভোটে ফিরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
একজন মানুষের জীবনে এতগুলো পরিচয় খুব বেশি আসে না।
আর এ কারণেই সালাহউদ্দিন আহমদকে তাঁর পদ দিয়ে নয়, তাঁর পথ দিয়ে বিচার করা উচিত।
তাঁকে আমি চিনেছি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে আমরা চার বছরেরও বেশি সময় সহকর্মী ছিলাম। তিনি আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র। কাজের ধরনও ছিল প্রায় একই। কর্মক্ষেত্রে তাঁকে দেখেছি প্রচণ্ড কর্মঠ একজন মানুষ হিসেবে। আর ব্যক্তিগত ব্যবহারে ছিলেন অতিশয় সজ্জন।
এই ব্যক্তিগত স্মৃতিটির কথা বলছি কারণ পরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যত ঝড় এসেছে, সেই ঝড়ের মধ্যে মানুষটিকে চিনতে আমার জন্য এই স্মৃতিই সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হয়ে থেকেছে।
১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের কোনো একদিনের কথা।
তিনি আমাকে বললেন, “আমি ইলেকশন করবো। আমার রেজিগনেশন একদিনের মধ্যে একসেপ্ট করিয়ে দিতে পারবে?”
আমি বললাম, পারব।
তবে তাঁকে একটি পরামর্শও দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বিরোধী দলের বয়কটের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিয়ে রাজনীতি শুরু না করাই ভালো। আমার যুক্তি ছিল খুব সরল—যে নির্বাচনে শক্ত প্রতিপক্ষ নেই, সেই নির্বাচনে জিতলে সংসদে যাওয়া যায় বটে, কিন্তু বড় রাজনৈতিক লড়াই সম্পর্কে অজানাই থেকে যেতে হয়।
তখন কে জানত, জীবনের পরবর্তী লড়াইগুলো কোনো সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও কঠিন হবে!
সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি নির্বাচনে গেলেন। বিজয়ী হলেন। কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে সংগঠনকে শক্ত করলেন। ২০০১ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চারদলীয় জোট সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন এবং পুরো মেয়াদ কাজ করলেন।
কক্সবাজারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আলাদা ধরনের। তিনি শুধু নির্বাচনী রাজনীতি করেননি; এলাকার প্রশাসনিক ও যোগাযোগ অবকাঠামো নিয়েও কাজ করেছেন। পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠা, সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণ, উপকূলীয় জনপদের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করার নানা উদ্যোগ তাঁর মন্ত্রিত্বের সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ। কক্সবাজারের পরবর্তী বিকাশের পেছনে সেই সময়ের অবকাঠামোগত উদ্যোগের একটি ভূমিকা ছিল।
তারপর এল ওয়ান-ইলেভেন।
মামলা, কারাবাস, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ২০০৯ সালের নির্বাচনে তাঁর পরিবর্তে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। সালাহউদ্দিন ফিরে গেলেন কেন্দ্রীয় রাজনীতির দিকে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হলেন। পরে দলের মুখপাত্র।
এটি ছিল এমন এক সময়, যখন বিরোধী দলের মুখপাত্র হওয়া মানে শুধু দলের বক্তব্য দেওয়া নয়; প্রতিদিন রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতে দাঁড়িয়ে থাকা।
২০১৫ সালের মার্চে সেই সংঘাত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ রূপ নিল।
রাজধানীর এক বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেলো হাসিনার গুম বাহিনী।
২০১৫ সালের মার্চে সেই সংঘাত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ রূপ নিল।
দরজা ভেঙে বস্তায় ভয়ে তুলে নিয়ে গেলো হাসিনার গুম বাহিনী।
একজন মানুষ হঠাৎ করে নিজের বাড়ি থেকে, নিজের পরিবার থেকে, নিজের পরিচিত পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
তখন আমি লিখেছিলাম—“সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। গত একসপ্তাহ ধরে উনার কোনো খোঁজ মিলছে না। তিনি অন্ধকার জগতের লোক নন। এলাকায় তিনি বিপুল জনপ্রিয়। তিনি কেবল একজন রাজনীতিকই নন, একজন আমলাও ছিলেন। বিসিএস প্রশাসনে তার ব্যাচটি ৫৫০ জনের, এর বাইরে পররাষ্ট্র, পুলিশ, কর, হিসাব, ও নানা ক্যাডারে তার প্রচুর সমর্থক রয়েছে, যা নিয়ে বর্তমান সরকারী দল অস্বস্তিতে থাকে। এর বাইরে সিভিল সার্ভিসে সিনিয়র জুনিয়র, এবং সামরিক বাহিনীতেও আছে তার অনেক বন্ধু বান্ধব, বিএমএ কোর্সমেট। এ অবস্থায়, কোনো বাহিনী সালাহউদ্দিন আহমেদকে কোনোভাবেই গায়েব করে দিয়ে পার পাবে না। কেননা বিভিন্ন মিডিয়ায় ইতোমধ্যেই প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ননা চলে এসেছে যে, ডিবি পুলিশ দরজা ভেঙ্গে তাকে আটক করেছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট কনসার্ন হয়েছে, ঢাকার সকল কূটনীতিকরা বিষয়টি মনিটর করছেন।” তখন পুলিশ প্রধান ছিলেন তাঁরই ব্যাচমেট বেনজির। আরও লিখলাম, “এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীর দায়িত্ব হবে, সালাহউদ্দিন আহমদেকে অবিলম্বে ছেড়ে দেয়া, নতুবা মামলা থাকলে তাকে আদালতে তোলা। এটাই তাদের বাঁচার একমাত্র পথ। আর যদি কোনো হটকারিতা করে সালাহউদ্দিনকে হত্যা করা হয়, তবে সেই দায়ে সংশ্লিষ্ট সবাই ভবিষ্যতে ফেঁসে যাবে। কেউ বাঁচবে না মৃত্যুদন্ড থেকে। এটা অবধারিত। তখন কোনো রাজনীতিবিদ হুকুমের দায়িত্ব স্বীকার করবে না, এমনকি বাঁচাতেও আসবে না। তবে রাজনীবিদরাও এখনি তাদের নিজেদের ভবিষ্যতটিও হিসাব করে নিতে পারেন- আজ যদি সালাহউদ্দিনের হয় এই ভাগ্য, কাল আরো অনেকের যে সেটা হবে, সন্দেহ নাই। এমতাবস্থায় সুচিন্তা ও সঠিক কাজটিই করুন, খুব দ্রুত।“
আজ এত বছর পরে সেই লেখাটি ফিরে পড়লে মনে হয়, তখন আমরা জানতাম না এই অন্ধকার কত দীর্ঘ হবে।
পরিবার অপেক্ষা করছিল। দল অপেক্ষা করছিল। দেশ অপেক্ষা করছিল।
পরে তাঁকে পাওয়া গেল ভারতের শিলংয়ে।
শুরু হলো নয় বছরের নির্বাসিত জীবন।
শিলংয়ের রাত______
এই জায়গাটিতে আমার নিজের স্মৃতি এসে পড়ে।
গুমের পর শিলংয়ে তাঁর নির্বাসিত জীবনের নয় বছরে রাত্রিবেলায় আমি ছিলাম তাঁর নিত্যকার সঙ্গী। সপ্তাহের অন্তত অর্ধেক দিন কথা হতো।
কথা কখনও ছোট হতো না।
রাজনীতি, আন্দোলন, সংগ্রাম, দলের খবর, কে কোথায়, ম্যাডামের অবস্থা, দেশের পরিস্থিতি—সবই আসত। আলোচনা হতো আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও। আমেরিকা কী ভাবছে, স্যাংশন হবে কি না, আন্দোলন কোন পথে নেওয়া যায়—রাতের পর রাত এসব নিয়েই কথা হয়েছে।
দূরে থেকেও তাঁর মন পড়ে থাকত বাংলাদেশে।
কখনও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। কখনও ভবিষ্যতের হিসাব। কখনও হতাশা। কখনও প্রবল আশাবাদ। কখনও বলতেন আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে।
এক রাতে তিনি খুব ভেঙে পড়লেন।
আবেগে বললেন,
“এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেড বডিটা তুমি নিয়ে যেও। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিও। পরিবারের দিকে খেয়াল করো।”
কথাগুলো শুনে আমি কীভাবে উত্তর দিয়েছিলাম, আজও মনে আছে।
আমি বলেছিলাম, “আপনি নিশ্চয়ই দেশে ফিরবেন। আবার রাজনীতি করবেন। এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন, দেশ চালাবেন, দলের দায়িত্ব নেবেন।”
তিনি আমাকে মৃদু বকেছিলেন।
হয়তো তাঁর কাছে আমার কথাগুলো তখন বাস্তবতাবিবর্জিত মনে হয়েছিল।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, তিনি ফিরবেন।
কবে ফিরবেন, জানতাম না।
নয় বছর ধরে সেই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা চলল।
আইনি লড়াইয়ে তিনি মুক্তি পেলেন, কিন্তু দেশে ফেরার সুযোগ এল না। নির্বাসনই হয়ে রইল তাঁর বাস্তবতা। দূরদেশে থেকেও বিএনপির রাজনীতি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হননি। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন। দলের আন্দোলন ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নিয়মিত যুক্ত থাকলেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব লাভ এবং ৮ বিভাগীয় সমাবেশ শেষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি সফল করা। গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া।
তারপর ২০২৪।
৭ জানুয়ারীর ভুয়া নির্বাচনের পর তিনি দেশে ফিরতে চাইলেন।
আমি বাধা দিলাম।
বললাম, “এখন নয়। আপনি অবশ্যই দেশে ফিরবেন সেদিন—যেদিন হাসিনা পালাবে। আর সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়।”
কথাগুলি তখন হয়তো অদ্ভুত শোনাত।
তারপর জুলাই এলো।
ছাত্রদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হলো। বিএনপিও আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে মাঠে থাকল। সালাহউদ্দিন আহমদও দূর থেকে রাজনৈতিক সমন্বয় ও কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখলেন।
৫ আগস্ট ২০২৪। আমার সৃষ্ট ৩৬ জুলাই।
হাসিনা দেশ ছাড়লেন।
এরপরে নয় বছর পর সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফিরলেন।
শিলংয়ের সেই রাতের কথাটি তখন হঠাৎ খুব মনে পড়েছিল।
“আমার ডেড বডিটা তুমি নিয়ে যেও।”
একজন মানুষ তখন মৃত্যুর কথা বলেছিলেন।
আমি বলেছিলাম, তিনি ফিরবেন।
তিনি ফিরলেন।
ফিরে এসে নতুন লড়াই______
দেশে ফিরে তাঁর সামনে ছিল নতুন বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জুলাই সনদ, সংবিধান সংশোধন, রাষ্ট্র সংস্কার, সংসদের ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান—এসব বিষয়ে বিএনপির অবস্থান নির্ধারণ ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। মানুষ টিভির সামনে বসে থাকতো, সালাহউদ্দিন সাহেব কী বলেন, অন্যদের প্রশ্নের জবাবে আইনী ব্যাখ্যা কী দেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও রিলস দেখে। পরবর্তীতে সংসদে এসেও আইনী বিতার্কিক ধারা চলমান, সাথে আছে চমৎকার উর্দু শায়েরী! আমাকে ফোনেও তিনি শোনাতেন।
এখানে তাঁর আইনজীবী ও সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা বিশেষ কাজে লাগে।
তিনি জানেন, আন্দোলন সরকার বদলায়; রাষ্ট্র বদলায় প্রতিষ্ঠান দিয়ে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি গণআন্দোলনের সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার রাজনৈতিক শক্তি একটি কার্যকর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারে______
২০২৬ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে আবার সংসদ সদস্য হলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন।
এ যেন ইতিহাসের এক আশ্চর্য পরিহাস।
একসময় তিনি ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট—রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করতেন।
পরে তিনি ছিলেন সরকারের মন্ত্রী।
তারপর আন্দোলনরত দলের নেতা ও মুখপাত্র।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতার শিকার হলেন।
গুম হলেন।
নয় বছর নির্বাসনে কাটালেন।
আজ সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর হাতে।
এখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু আইনশৃঙ্খলার মন্ত্রণালয় নয়। এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণেরও জায়গা।
যে মানুষ নিজেই একসময় অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর কাছে মানুষের প্রত্যাশা তাই অন্যদের চেয়ে বেশি।
সবচেয়ে বড় অর্জন______
সালাহউদ্দিন আহমদের জীবনের সেরা অর্জন কোনো পদ নয়।
এমপি হওয়া নয়।
মন্ত্রী হওয়া নয়।
এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়াও নয়।
তাঁর বড় অর্জন হলো—তিনি নিজেকে হারাননি।
গুম তাঁকে ভাঙতে পারেনি। নির্বাসন তাঁকে রাজনীতি থেকে সরাতে পারেনি। নয় বছরের অপেক্ষা তাঁর বিশ্বাস কেড়ে নিতে পারেনি।
তিনি ফিরে এসেছেন।
এবং ফিরে এসে আবার জনগণের ভোট পেয়েছেন।
এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও তাঁর গুরুত্ব এখানেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নেতা খুব বেশি নেই, যিনি একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে দেখেছেন, রাজপথ থেকে রাজনীতিকে দেখেছেন, সংসদে আইন নিয়ে কাজ করেছেন, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিরোধী দলের কঠিন সময় সামলেছেন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকারও হয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতার সমন্বয় বিরল।
বিএনপি যদি ভবিষ্যতের বাংলাদেশে শুধু একটি নির্বাচনী দল নয়, একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে সালাহউদ্দিন আহমদের মতো অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ নেতাদের আরও বড় দায়িত্বে দেখতে হবে।
বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, সাংবিধানিক বিষয়, সংসদীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দলীয় নীতি নির্ধারণে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
কারণ ক্ষমতায় যাওয়া এক পরীক্ষা।
ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্র রক্ষা করা আরও বড় পরীক্ষা।
আর ক্ষমতার সীমা মনে রাখা—সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সালাহউদ্দিন আহমদের নিজের জীবন তাঁকে এই পরীক্ষার জন্য অন্যরকম প্রস্তুতি দিয়েছে।
শেষ কথা______
শিলংয়ের সেই রাতগুলো আমার কাছে এখনো স্পষ্ট।
একজন নির্বাসিত মানুষ ফোনের ওপারে।
দেশের খবর জানতে চাইছেন।
রাজনীতির হিসাব করছেন।
আন্দোলনের পথ খুঁজছেন।
কখনও হতাশ।
কখনও আশাবাদী।
তারপর এক রাতে বললেন—
“এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেড বডিটা তুমি নিয়ে যেও।”
আমি বলেছিলাম—
“আপনি ফিরবেন। আবার রাজনীতি করবেন। এমপি হবেন। মন্ত্রী হবেন। দেশ চালাবেন।”
তখন কথাটি ছিল বিশ্বাস।
আজ তার কিছুটা বাস্তবতা।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
দেশে ফিরে আসা তাঁর জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। এখন শুরু হয়েছে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়—ক্ষমতার ভেতর থেকে সেই রাষ্ট্রকে বদলানোর চেষ্টা, যে রাষ্ট্রের অন্ধকার একদিন তাঁকেই গিলে খেতে চেয়েছিল।
সাফল্যের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা হয়তো এটাই—
যে অন্ধকার আপনাকে একদিন গ্রাস করতে চেয়েছিল, ফিরে এসে আপনি যেন সেই অন্ধকার আর কাউকে গ্রাস করতে না দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে এখন সেই সুযোগ।
শিলংয়ের নয় বছরের রাতের যদি কোনো উত্তর থাকে, সেটি পদ-পদবিতে নয়।
একটি এমন বাংলাদেশে—
যেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আর বলতে হবে না, “আমার ডেড বডিটা নিয়ে যেও।”
লেখক : বিশ্লেষক ও লেখক, সিনিয়র সচিব।

