
সবেমাত্র ভোর গড়িয়ে সকাল হয়েছে, ৮টা বাজে। এরই মধ্যে রাজধানীর সড়কে নেমে পড়েছেন কর্মীজীবী মানুষেরা। একদল যখন কর্মক্ষেত্রে ছুটতে ব্যাস্ত ঠিক তখনই ভিন্ন চিত্র দেখা যায় রাজধানীর তেল পাম্পগুলোতে। একের পর এক লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পাম্পে তেলের অপেক্ষায় অলস সময় কাটাতে ব্যস্ত যানবাহন চালকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে অস্থির গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার। বাংলাদেশেও গত দেড় মাস ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে সংকট। এতদিন জেট ফুয়েল ছাড়া অন্য জ্বালানির দাম না বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের নতুন দাম মধ্যরাত (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। আজ রোববার থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও প্রতিদিনের মতো আজও সকাল থেকেই পাম্পগুলোতে তেল সংগ্রহে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
রোববার রাজধানীর আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন এবং মেঘনা ফিলিং স্টেশন ঘুরে যানবাহনের এমন দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর এই তিনটি তেল পাম্পের সামনেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। তবে এত সকালে কোনো পাম্পে তেল বিক্রি শুরু না হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন যানবাহন চালকরা। অপেক্ষা করছেন তেলের জন্য।
পাম্পে অপেক্ষারত যানবাহন চালকদের ভাষ্য, গতকাল রাত থেকেই তারা তেল সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন।
সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে তেলের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছেন শাহীন। তিনি বলেন, গতকাল সন্ধায় এসে দাড়িয়েছি। রাত ১১ টা পর্যন্ত পাম্প থেকে তেল দিয়েছে। তারপর তেল শেষ হয়ে গেছে। আজ আবার তেল দেওয়া শুরু হলে তেল নিয়ে তারপর বাসায় যাবো।
হাফিজ নামের অন্য একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, কাল দুপুর ৩টার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছি। যখন লাইনে দাঁড়িয়েছি তখন লাইনের শেষ মাথা ছিল টাউনহল পর্যন্ত। পরে টাউনহল থেকে আসাদগেট পর্যন্ত আসতে আসতেই তেল শেষ। রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনও পাম্প খোলেনি।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় পাম্পগুলোতে যানবাহন চালকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে সরকারের তেলের দাম বাড়ানো সঠিক সিদ্ধান্ত। আবার কেউ কেউ বলছেন সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে মূলত সিন্ডিকেট ভাঙতে, পাম্পগুলোতে যেন ভিড় কমানো যায়। কিন্তু সরকার তেলের দাম না বাড়িয়ে যদি সব বন্ধ হয়ে যাওয়া পাম্পে তেল বিক্রির ব্যবস্থা করতো তাহলে গ্রাহকদের ভিড় কমে যেতো।
রাজধানীর মগবাজার থেকে তেল নিতে পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে এসে লাইনের শেষের দিকে দাঁড়িয়ে আছেন মেজবা উদ্দিন। তিনি বলেন, সকাল ৭টার সময় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এত পেছনে। কাল রাত থেকেই সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে। সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। ভাবছিলাম আজ হয়তো লাইন কমবে কিন্তু আগের মতোই আছে।
তিনি বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে যেন সিন্ডিকেট ভাঙা যায়। পাম্পগুলোতে যেন চাপ কমে। পাম্পের চাপ কমাতে, দাম বাড়লে হবে না। যার তেল প্রয়োজন তাকে তেল নিতেই হবে। পাম্পের এই চাপ কমাতে হলে সরকারের উচিত বন্ধ হয়ে যাওয়া সব পাম্পে তেল দেওয়া চালু করা। তাহলে পাম্পের চাপ কমবে। অথচ সরকার বলছে তেল পর্যাপ্ত আছে। তেল পর্যাপ্ত আছে তাহলে পাম্প বন্ধ কেন? তেল পর্যাপ্ত আছে তাহলে দাম বাড়লো কেন? মানুষ কেন তেল মজুত করছে? কারণ সরকার তেল দিতে পারছে না। পাম্পগুলো বন্ধ থাকছে। এজন্য তেল পর্যাপ্ত মজুত আছে বললেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। যার কারণে মানুষ অবৈধভাবে তেল মজুত করছে।
আবার ভিন্ন কথা বলছেন কিছু যানবাহন চালক। তাদের ভাষ্য- সরকারের তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে পাম্প মালিক ও সাধারণ মজুতদাররা সিন্ডিকেট করতে পারবে না। ফলে তেল পাম্পগুলোতে ভিড় কমবে।
তেলের লাইনে অপেক্ষারত সাইফুল নামের এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, কাল রাত ১১টার দিকে এসে দাঁড়িয়েছি। এখনো তেল পাইনি।
তেলের দাম বৃদ্ধির এমন সিদ্ধান্ত কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার দাম বাড়িয়েছে। একদিক থেকে ভালো করেছে। অনেকেই দাম বাড়ার আশঙ্কায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেল মজুত করছিল। আবার কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়ে সেই তেল বেশি দামে বাইরে বিক্রি করতো। যার কারণে কিছু মানুষ বারবার লাইনে দাঁড়াতেন। সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে এখন আর এই সিন্ডিকেটের চাপটা থাকবে না। আশা করা যায় দুই-একদিনের মধ্যে এই সমস্যা কেটে যাবে।
এদিকে, গতকাল মন্ত্রনালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাদ্যমে এপ্রিল মাসে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বেড়েছে।
সর্বশেষ, গত ১ ফেব্রুয়ারি সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে দুই টাকা কমানো হয়েছিল। সেই দাম মার্চ মাসেও বহাল থাকে। এপ্রিল মাসেও আগের দাম বহাল রাখা হয়।
এর আগে, সবশেষ ৭ এপ্রিল বিমানে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল বা জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়। বিইআরসি ঘোষিত দাম অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার (শুল্ক ও মূসকমুক্ত) নির্ধারণ করা হয়।

