
ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের শূন্য আসনটি পূরণের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত বিশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার রাজ্য সিনেটর আয়েশা ওয়াহাব। নির্বাচনের শেষ সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত একচ্ছত্র আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপনী প্রচারণা ডিঙিয়ে তিনি এই জয় ছিনিয়ে নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রগতিশীল আয়েশা তার প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট মেলিসা হার্নান্দেজকে পরাজিত করেছেন।
তিনি এখন ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করবেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য সোয়ালওয়েলের মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ের জন্য, যা জানুয়ারিতে শেষ হবে। যার মধ্যে সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে
এক বিবৃতিতে আয়েশা বলেন, 'যে এলাকা আমাকে বড় করে তুলেছে, আমি তার জন্য লড়াই করব।' তিনি আরও বলেন, তার এই বিজয় প্রমাণ করে যে তার এলাকাকে অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তার মতে, 'ফোস্টার কেয়ার থেকে কংগ্রেসে পৌঁছানোর এই পথচলা আমেরিকান স্বপ্নের বাস্তব সম্ভাবনাকেই তুলে ধরে।'
ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য আইনসভায় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ওয়াহাব যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রথম আফগান-আমেরিকান সদস্য হতে যাচ্ছেন।
যৌন নিপীড়নের কিছু অভিযোগ ওঠার পর এপ্রিলে সোয়ালওয়েল পদত্যাগ করলে এই বিশেষ নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনকে নতুন একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, যেখানে গাজায় দেশটির গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জুলাই মাসে প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) একটি জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে—যা জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও সমর্থন করে।
যদিও পররাষ্ট্রনীতি তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল ভিত্তি ছিল না, তবে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে আয়েশাও এই একই ধরনের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
গত বছর তিনি ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য বিধানসভায় 'গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের' তীব্র নিন্দা এবং যুদ্ধ সমাপ্তির আহ্বান জানিয়ে একটি রাজ্যের প্রস্তাবনার সহ-রচয়িতা ছিলেন। এপ্রিলে প্রার্থীদের এক আলোচনা সভায় আয়েশাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের সাথে যা ঘটছে তা গণহত্যা বলে তিনি বিশ্বাস করেন কি না, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন 'হ্যাঁ'।
বিপরীতে, হার্নান্দেজ কোনো সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েলের নিজেকে রক্ষা করার অধিকার থাকলেও গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ 'অনেক বেশি বাড়াবাড়ি' পর্যায়ে চলে গেছে।
পরবর্তী সময়ে জুন মাসের বিশেষ নির্বাচনের প্রাথমিক পর্বে আয়েশা ৪২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হন, যেখানে হার্নান্দেজ পেয়েছিলেন ১৭ শতাংশ ভোট।
তবে গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপিএসি ) সাথে যুক্ত 'ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট' আগস্টের শুরু থেকে হার্নান্দেজকে সমর্থন যোগাতে প্রায় ২৫ লাখ ডলার ব্যয় করার পর এই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি বেশ কঠিন হয়ে ওঠে।
সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে যে, এআইপিএসি থেকে তহবিল প্রাপ্ত 'বোল্ড আমেরিকা' নামের আরেকটি গোষ্ঠীও এই দৌড়ে ১৯ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।
যদিও ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে, তবুও ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মৌসুমে দেশজুড়ে তারা বেশ কিছু বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে।
মিশিগান সিনেটে প্রার্থিতা প্রত্যাশী আব্দুল এল-সায়েদের মতো প্রগতিশীল প্রার্থীরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের বাছাইপর্বে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিপুল অর্থ খরচকে পেছনে ফেলে আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন।
তবে সেই খরচের একটি অংশ এমন বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলের নাম ছিল না কিংবা বিষয়টিকে তেমন প্রাধান্য দেওয়া হয়নি।
উদাহরণস্বরূপ, আয়েশার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনে এক বিভ্রান্তিকর দাবির ওপর জোর দেওয়া হয়—যেখানে বলা হয়, তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারবিরোধী আইনকে দুর্বল করেছেন।
এর জবাবে আয়েশা তার নিজস্ব একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বলেন, তিনি 'অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাচার বা যৌন কাজে লিপ্ত করাকে সর্বতোভাবে বেআইনি ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে নিশ্চিত করেছেন'। প্রচারিত ওই বিজ্ঞাপনটিকে তিনি '৫০ লাখ ডলারের মিথ্যাচার' বলে আখ্যা দেন।
অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় থাকাকালীন আয়েশা সাশ্রয়ী আবাসন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোতে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং জাতিভেদ বা জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে একটি বিল তৈরি করেছিলেন। তবে বিলটিতে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম ভেটো প্রদান করেন।
নভেম্বরে আয়েশা ও হার্নান্দেজ আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, যেখানে উভয় নারী ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম ডিস্ট্রিক্টের পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
আয়েশার বিজয়ের জবাবে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত প্রগতিশীল কংগ্রেস সদস্য রো খান্না অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'আপনার এই নির্ণায়ক বিজয়ে অভিনন্দন আয়েশা ওয়াহাব। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সম্মানজনক জীবনধারণের উপযোগী মজুরি এবং ইরানে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে আপনার সাথে কাজ করার অপেক্ষায় রইলাম।'

