
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ৩৯ দিন ধরে ইরানে আগ্রাসন চালাচ্ছে। যৌথ হামলার জবাব অস্ত্র দিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে বিশ্বের জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতেই পুরো পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে তেল ও গ্যাস সংকট।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির শুধু শুরু মাত্র। এটি প্রভাবিত করছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে। একই সঙ্গে খাদ্যের দামও শিগগিরই বাড়বে। এমনকি সংঘাত শেষ হলেও এই উচ্চমূল্য কিছু সময় ধরে স্থায়ী হবে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় একই অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও এই পথ দিয়ে যায়, যা বিশ্বজুড়ে ভালো ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক কৃষি নির্ভর করে সঠিক সময়ে গাছের কাছে পুষ্টি পৌঁছে দেওয়ার ওপর। যখন সার দেরিতে পৌঁছায় বা পর্যাপ্ত পরিমাণে কেনা খুব ব্যয়বহুল হয়ে যায়, তখন কৃষকদের সামনে তিনটি পথ থাকে—সারের ব্যবহার কমানো, কম ফসল চাষ করা, অথবা কম সার লাগে এমন ফসল বেছে নেওয়া। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামগ্রিক উৎপাদন কমে যায়; ফলে খাবার, পশুখাদ্য ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের উপাদানের সরবরাহ হ্রাস পায়।
অবশেষে ভুট্টার দাম বাড়লে গ্রীষ্মকালীন বারবিকিউয়ের স্বাদ বদলে যেতে পারে বা খরচ বেড়ে যেতে পারে। ভুট্টা আর সস্তা নাও থাকতে পারে, এবং ভুট্টা-খাওয়ানো গরুর মাংসও ব্যয়বহুল হবে। এছাড়া অনেক প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয় হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ দিয়ে, যেগুলোর দামও বাড়বে।
কৃষকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
বিশ্বের প্রধান তিনটি খাদ্যশস্য—ভুট্টা, গম ও চাল—মানবজাতির মোট ক্যালরির অর্ধেকেরও বেশি সরবরাহ করে। উৎপাদন সর্বোচ্চ করতে এই ফসলগুলোর জন্য তিনটি প্রধান পুষ্টি দরকার: নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশিয়াম। নাইট্রোজেন গাছের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, ফসফরাস কোষে শক্তি পরিবহন, মূল ও ফল গঠনে সাহায্য করে, আর পটাশিয়াম পানি সংরক্ষণ ও প্রোটিনের মাত্রা বাড়াতে সহায়ক।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই তিনটিরই সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। নাইট্রোজেন সার উৎপাদনের খরচের ৭০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভর করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। যুদ্ধের কারণে এর উৎপাদন ২০ শতাংশ কমেছে এবং দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। নিজেদের মজুদ রক্ষায় রাশিয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রপ্তানি স্থগিত করেছে।
একইভাবে বিশ্বের বৃহত্তম ফসফেট উৎপাদক চীন ফসফেট রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের ২৫ শতাংশ কমে গেছে।
পটাশিয়াম সমৃদ্ধ পটাশের সরবরাহও আগেই কম ছিল, বিশেষ করে বেলারুশ ও রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে।
ফলে বিশ্বজুড়ে সারের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসের মধ্যে কিছু সারের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়।
প্রথম ধাক্কা কৃষকদের ওপর
ধানজাতীয় ফসল তাদের অধিকাংশ নাইট্রোজেন প্রয়োজন বৃদ্ধি পর্যায়ের শুরুতেই শোষণ করে। পরে সার দিলে তা কম কার্যকর হয়।
নাইট্রোজেন ১০–১৫ শতাংশ কম ব্যবহার করলে বা ২–৪ সপ্তাহ দেরিতে প্রয়োগ করলে ভুট্টার ফলন ১০–২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ভুট্টা ও গমের উৎপাদন কমলে শুধু মানুষের খাদ্য নয়, পশুখাদ্যের সরবরাহও কমে যায়। ফলে পশুপালনের খরচ বাড়ে এবং মাংস ও প্রাণিজ পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
খাদ্যের খরচ অসহনীয় হয়ে উঠলে কৃষকদের ভবিষ্যতের উৎপাদনের জন্য রাখা গাভী ও শূকর বিক্রি বা জবাই করতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে খরা ও উচ্চ খরচের কারণে গরুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ সংকট তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত এই খরচ ভোক্তাদের ওপরই চাপানো হয়। ২০১২ সালে ভুট্টার ফলন কমে যাওয়ার ফলে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুরগির মাংসের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
টাকা দিয়েও সব সমস্যার সমাধান নয়
২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে সারের সরবরাহ ছিল স্বাভাবিকের প্রায় ৭৫ শতাংশ। এই সময়েই সাধারণত কৃষকরা জমি প্রস্তুত ও সার প্রয়োগ শুরু করেন।
কৃষকরা যদি আশঙ্কা করেন যে তারা ভুট্টার উৎপাদন সর্বোচ্চ করতে পারবেন না, তাহলে তারা কম ভুট্টা চাষ করতে পারেন বা কম সার লাগে এমন সয়াবিনের দিকে ঝুঁকতে পারেন—যা ভুট্টার সরবরাহ আরও কমাবে।
সরকারি সহায়তা বা ঋণ কিছুটা খরচ সামলাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত সার না থাকলে সেই সমস্যা সমাধান করতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো অন্য দেশের মতো তীব্র জ্বালানি বা খাদ্য সংকট না থাকলেও খরচ বাড়বে। জ্বালানি ও জেট ফুয়েলের দাম ইতোমধ্যে বাড়ছে। খাদ্যের ওপর এর প্রভাব কিছুটা দেরিতে দেখা গেলেও তা অনিবার্য।
বিশ্ববাজারের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রও প্রভাবিত হবে। ২০২৬ সালে ফসল কম উৎপাদন এবং চীন ও ভারতের মতো জনবহুল দেশে পশুখাদ্যের চাহিদা বাড়ায় ভুট্টার বৈশ্বিক দাম বাড়বে।
খাদ্যের দাম কত দ্রুত এবং কতটা বাড়বে, সেটিই এখন ভোক্তাদের বড় প্রশ্ন।
সাধারণত খামারের দাম বাড়লে পাইকারি বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ে, কিন্তু খুচরা বাজারে তা পৌঁছাতে ২ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কম প্রক্রিয়াজাত ভুট্টাজাত খাবারের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, কিন্তু সিরিয়াল বা মুরগির মাংসের দাম বাড়তে কিছুটা বেশি সময় লাগে। গরুর মাংসের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব আরও দেরিতে আসে।
জ্বালানি ও প্যাকেজিং খরচের মতো পরোক্ষ খরচও পরে এসে যুক্ত হয়। পরিবহন খাতে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ আরোপ করা হচ্ছে।
নিম্নআয়ের মানুষের ওপর প্রভাব বেশি পড়ে, কারণ তারা তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও বাসস্থানে ব্যয় করে। ফলে মুরগির মতো তুলনামূলক সস্তা প্রোটিনও তাদের জন্য নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে যেতে পারে। একটি বৈশ্বিক খাদ্য জরুরি অবস্থা সারের দাম ও সরবরাহ সারা বিশ্বকে প্রভাবিত করবে।
ইতোমধ্যে ৩০ কোটির বেশি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার পায় না। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আশঙ্কা করছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও ৪৫ মিলিয়ন মানুষ এতে যুক্ত হতে পারে।
ভারত ও ব্রাজিলে ২০২৬ সালে ফসলের উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। পূর্ব আফ্রিকার কৃষকরা আগেই সারের উচ্চ দামের চাপে ছিল, এখন তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এই সমস্যাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে দূরের মনে হলেও খাদ্যের দাম বৈশ্বিক—এবং যুদ্ধের এই অতিরিক্ত খরচ খুব শিগগিরই সবার জীবনে প্রভাব ফেলবে। - সূত্র: এনডিটিভি।
আমার বার্তা/এমই

