বাংলাদেশ রেলওয়ের মেগা প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ | অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট সেতু এবং সিডিআরপি-র মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে দরপত্র মূল্যায়নে নজিরবিহীন জালিয়াতি, গুরুতর অডিট আপত্তি ধামাচাপা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় জমি দখলের মাধ্যমে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগের তীর রেলওয়ের প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা এবং বিতর্কিত কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে।
যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে অডিট বিভাগের এক বিশেষ নিরীক্ষায় মোট ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে। যেখানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায় চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমিয়ে এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ১,৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এছাড়া উচ্চ হারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১,২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ (Country of Origin) নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিল ছাড় করা হয়েছে। এমনকি ড্রয়িং-ডিজাইন ও বিওকিউ (BOQ) ছাড়াই ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে আরও ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা গচ্চা গেছে।
অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর (Luxury Vehicles) কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, যমুনা রেলসেতুর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছে।
কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পে দরপত্রের জালিয়াতি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য দরপত্রের বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল ‘বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি। কিন্তু ‘স্যামবো-জেভি’ (SAMBO-led JV) নামের প্রতিষ্ঠানটি এমন একজনের সিভি জমা দিয়েছে, যার ডিগ্রি হলো ‘বিএসসি ইন এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) এবং দাতা সংস্থা ইডিসিএফ-এর (EDCF) নীতিমালা অনুযায়ী, দরপত্র জমা দেওয়ার পর মৌলিক যোগ্যতার (Material Qualification) কোনো ঘাটতি সংশোধনের সুযোগ নেই। কিন্তু প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান চলতি বছরের (২০২৬) ৩ আগস্ট একটি গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে দরদাতার কাছে জানতে চান। এই কৃষিনির্ভর ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না! একজন বিডার এ বিষয়ে সরাসরি সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করে বলেছেন, কৃষিশিক্ষা ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এক নয় এবং এই জালিয়াতিকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সিডিআরপি (CDRP) প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে দ্বৈত নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। নথিপত্র বলছে, ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের বড় ধরনের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।
প্রকল্পের শর্ত (ITB 37.4) অনুযায়ী, একাধিক কন্ট্রাক্টের (WD-1 ও WD-2) কাজ পেতে হলে বিডারের সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার (AACT) ২২০ মিলিয়ন ডলার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ম্যাক্সের টার্নওভার রয়েছে মাত্র ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলার। নিয়ম অনুযায়ী, একাধিক কাজ পেতে হলে শুধু সর্বনিম্ন দরদাতাই নয়, বরং একাধিক কাজ একসাথে সামলানোর মতো আর্থিক তহবিল, যন্ত্রপাতি এবং জনবলের সম্মিলিত সক্ষমতা থাকতে হয়।
অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে Completion Certificate, SIL-4/User Certificate বা Test Report-এর সামান্য ঘাটতির কারণে তাদের টেকনিক্যালি ‘নন-রেসপন্সিভ’ (বাতিল) করা হয়েছে। অথচ মৌলিক ও বাধ্যতামূলক যোগ্যতায় ঘাটতি থাকার পরও ম্যাক্সকে যোগ্য বিবেচনা করে প্রায় ১,৪৬১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের অজুহাত দেখিয়ে কাজ দেওয়ার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাব খসড়া নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হলে প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়সীমা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রকল্পের বাইরে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনায় চলছে আরেক নৈরাজ্য। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সীমানা রক্ষা ও দখল রোধ করতে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (DEN) একজন জেলা প্রশাসকের (DC) সমমর্যাদার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খিলগাঁও এলাকায় রেলের শতকোটি টাকার জমিতে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে রেলের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা এসব দখলদারদের উচ্ছেদ করছেন না। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং রেল কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়েই রেলের জমিতে এই বিশাল অবৈধ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেছেন, রেলওয়ের মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়ে কিছু তথ্য আমার কাছে এসেছে। এটি তদন্ত সাপেক্ষে দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। মেগা প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের এই মহোৎসব বন্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
