বিসিআইসির চেয়ারম্যান ও পিডি’র সঙ্গে গোপন সমঝোতায় বাফার ৩৪ সার গুদাম নির্মাণে অনিয়ম
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৮ | অনলাইন সংস্করণ
মোস্তফা সারোয়ার:

প্রতি বছর কৃষকের কাছে মানসম্মত ‘সার’ সহজলভ্য করতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় সরকার। কিন্তু আমদানি ও দেশে উৎপাদিত এসব সার সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে জমাট বেঁধে নষ্ট হয়। একই সঙ্গে সংরক্ষণের অভাবে প্রয়োজনীয় সময় সার পান না কৃষক। এ কারণে সার সংরক্ষণ ও বিতরণের সুবিধার্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাফার গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এরই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাফার গুদাম নির্মাণে একটি প্রকল্প নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল আপৎকালীন ৮ লাখ টন সার মজুত নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে সার পৌঁছানোর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। প্রকল্পটির আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে দেশে ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি বিসিআইসি।
একাধিক সুত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতেই ভুমি অধিগ্রহন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। পরবর্তীতে সেই জটিলতা নিরসন হলেও প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মার্ণের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে বিসিআইসি চেয়ারম্যান ও প্রকল্পের পিডি’র খাই খাই স্বভাবের কারণে কয়েকবার রিটেন্ডার করা লাগে। এতে করে প্রকল্প বাস্তবায়নে অহেতুক বিলম্ব ঘটে। নানা অভিযোগ ওঠায় বারবার এই প্রকল্পের পিডি বদল করা হয়। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে দলীয় তদবীরে এই প্রকল্পের পিডি পদে নিয়োগ পান শতভাগ দুর্নীতিবাজ মো: মঞ্জুরুল হক। তিনি প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েই নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে দুদকেও অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি। বিসিআইসির আরেক দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমানের আর্শীবাদে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন পিডি মঞ্জুরুল হক।
সম্প্রতি বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান ও ৩৪টি সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পের পিডি মো: মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি আওয়ামী সুবিধাভোগি ৩ টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে সমঝোতার ভিত্তিতে ১৫ টি গুদাম নির্মাণের ঠিকাদারী কাজ দিয়ে শতকোটি কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন। তিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হলো: সালাম কন্সট্রাকশন, এস এস রহমান এবং মজিদ সন্স কন্সট্রাকশন। গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে ১৫ টি গুদাম নির্মাণের কাজ দেওয়া হয় এই সব ঠিকাদারী ফার্মগুলোকে। বিগত আওয়ামী সরকার আমলেও তারা হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলো। আওয়ামী সরকারের আমলে দেশ লুটপাট সিন্ডিকেট এর সদস্য হিসাবে তাদের স্বীকৃতি রয়েছে। অথছ: এই সব প্রতিষ্ঠানকে হাজার কোটি টাকার কাজ দিয়ে লালন পালন করছেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান ও পিডি।
সুত্রমতে,গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে বিআইডব্লিউটিএর মাফিয়া ডনখ্যাত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এসএস রহমানকে ৬ টি জেলার ৬ টি সার গুদাম নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো: সাতক্ষীরা,বগুড়া,গাইবান্ধা,রংপুর,মেহেরপুর ও চুয়াডাংগা। প্রতিটি গুদামের নির্মাণ ব্যায় ৬০/৭০ কোটি টাকা। অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, ডিপিপি’র নিয়ম ভংগ করে এই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদারী কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিকালে কন্ডিশনাল ব্যাংক কমিটমেন্ট দিয়েছে যা গ্রহনযোগ্য নয়। অন্যদিকে তারা অতি নিন্মমানের রড,সিমেন্ট ও পাথর ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়াগেছে।
তাদের সাতক্ষীরা প্রকল্পের কাজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অতি নিন্মমানের পাথর দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। যে গ্রেডের পাথর ব্যবহার করার কথা সেটি করা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি এতই ক্ষমতাধর যে, কোন সাইড ইঞ্জিনিয়ার তাদের নিন্মমানের কাজে বাঁধা দিলেই পিডি মো: মঞ্জুরুল হ কে দিয়ে ওই ইঞ্জিনিয়ারকে বদলী বা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সুত্রগুলো আরো জানায়,প্রকল্পের প্রতিটি সাইটেই এমন দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হলেও বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমান ,পিডি মো: মঞ্জুরুল হক এবং ডিপিডি মোজাম্মেল হক নিরবতা পালন করছেন। তাদের এই নিরবতার রহস্য কি ? তা জানার জন্য নানা পথে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রতিটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে তারা মোটা অংকের কমিশন নিয়েছেন বিধায় অভিযোগ পেলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। আর সেই সুযোগে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো গুদাম রির্মাণ কাজে শুভাংকরের ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
আমার বার্তা/এমই
