সিরাতচর্চা আমাদের আখেরাতের পুঁজি : মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

  ইমরান ওবাইদ

মুমিন মাত্রই তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত হবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসারে। এটা ঈমানেরও দাবি। সে হিসেবে রাসুলের সিরাত পড়া, জানা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম’ সিরাতের সেই আদর্শ বাস্তবায়নে প্রতি রবিউল আউয়ালে সিরাত বিষয়ক নানামুখী আয়োজন করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও তারা আয়োজন করছে ‘নবীজির (সা.) জীবনীভিত্তিক জাতীয় সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা’। প্রথম পুরস্কার পবিত্র ওমরাহ পালনসহ রয়েছে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার পুরস্কার। 

পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে সিরাতের বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন আওয়ার ইসলাম সম্পাদক মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমরান ওবাইদ। 

প্রশ্ন: মহানবী (সা.)-এর সিরাত চর্চা, গবেষণা এবং যাপিত জীবনে তা বাস্তবায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব : রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে জানা, বোঝা এবং ব্যক্তিগত জীবনে বাস্তবায়ন করা একজন মুমিন হিসেবে আমাদের ঈমানের দাবি। আমরা নবীজির জীবনী পড়ব, অন্যকে পড়াব এবং নিজেদের জীবনে তা বাস্তবায়ন করব। রাসুলের জীবনের যত কাছাকাছি আমরা যেতে পারব, তাঁকে যত গভীরভাবে বুঝতে ও তাঁর আদর্শ অনুযায়ী আমল করতে পারব, ততই আমাদের জীবন সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও অর্থবহ হবে এবং আখেরাতে তা পুঁজি হিসেবে কাজে আসবে।

আমরা যারা নানামুখী কর্মের সঙ্গে যুক্ত, তাদের অনেকেই জীবনের কিছু ক্ষেত্রে রাসুলের আদর্শ অনুসরণ করি, আবার অনেক ক্ষেত্রেই তা ভুলে যাই। যেমন, আমরা যখন মসজিদে থাকি, তখন মুসল্লি হিসেবে রাসুলের জীবন ও আদর্শ অনুযায়ী নামাজ আদায় করি। কিন্তু আমরা যখন ব্যবসা করি, অফিসে চাকরি করি কিংবা বাইরে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন রাসুলের সিরাত অনুযায়ী নিজেকে সাজাতে ভুলে যাই।
আমাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে—যেমন খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, খাবার গ্রহণের আদব ইত্যাদি—রাসুলের সিরাত যতটুকু পরিমাণে চর্চিত, আমাদের মুয়ামালা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, চাকরি-বাকরি কিংবা কলকারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে রাসুলের আদর্শ ততটা চর্চিত নয়। আমাদের ভাবতে হবে, সর্বক্ষেত্রে আমরা তাঁকে কতটা অনুসরণ করছি।

নবীজি আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আদর্শ। তাই তাঁকে জানা, বোঝা এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হওয়া উচিত—আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি সেকেন্ড যেন নবীজির আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেই প্রত্যাশাই আমি করি।

প্রশ্ন: বছর ঘুরে সিরাতের মাস এলেই ‘আওয়ার ইসলাম’ সিরাত নিয়ে নানামুখী উদ্যোগ নিয়ে থাকে। এ পর্যন্ত সিরাত নিয়ে কী কী কাজ করা হয়েছে?

মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব : একজন আলেম যখন কোনো পত্রিকার সম্পাদক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন, তখন তাঁর চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনায় দ্বীনি ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়। ‘আওয়ার ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আমাদের মাথায় ছিল—রবিউল আউয়াল মাস এলে নবীজির সিরাত নিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা।

বিশেষ করে ‘নবীজিকে চিঠি লিখে জিতে নাও পুরস্কার’ নামে একটি আয়োজন করেছিল আওয়ার ইসলাম। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁরা নবীজির প্রতি ভালোবাসা, তাঁকে দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণের প্রত্যয় তুলে ধরেছিলেন সেই চিঠিগুলোতে।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পাওয়ার পর আমরা আয়োজন করি—‘নবীজিকে চিঠি লিখে ঘুরে এসো মদিনায়’। নবীজিকে চিঠি লেখা তরুণদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে মক্কা-মদিনা ভ্রমণ এবং পবিত্র ওমরাহ পালনের সুযোগ করে দিতে পেরেছিলাম সেই সময়।

এছাড়াও আমরা সিরাতভিত্তিক সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। গত বছরও সিরাতের ওপর সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকার রামপুরা চৌধুরীপাড়ায় মসজিদ-ই নূরে আমরা ‘সিরাত উৎসব’-এর আয়োজন করেছিলাম। সেখানে সিরাতের বইমেলা, সিরাতবিষয়ক বক্তৃতা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস এলেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে আলোচনা, গবেষণা এবং তাঁর চিন্তা-দর্শন নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে। রাসূলের জীবন ও সিরাতের বই মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়াকেও আমরা আমাদের দায়িত্বের একটি অংশ মনে করি।

প্রশ্ন: এ বছর ‘আওয়ার ইসলাম’ মহানবী (সা.)-এর জীবনীভিত্তিক জাতীয় সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। এখন পর্যন্ত কেমন সাড়া পেয়েছেন?

মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব : আলহামদুলিল্লাহ, ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিযোগিতায় প্রায় আড়াই হাজার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আরও বেশিসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ আশা করছি। চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আমাদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলবে। এ প্রতিযোগিতায় মাদরাসা, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—সব ধরনের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বাইরেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আমাদের আশার জায়গা। আমাদের তরুণদের হাতে মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন রচিত ‘আমাদের নবীজি’ গ্রন্থটি তুলে দিতে পারছি—এটিও আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়।

এ বছরও প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার হিসেবে রয়েছে ওমরাহ পালনের সুযোগ। দ্বিতীয় পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা এবং তৃতীয় পুরস্কার ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে আমরা ৭৫ জন বিজয়ীকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার পুরস্কার প্রদান করব। আগামী দিনগুলোতেও ‘আওয়ার ইসলাম’ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাবে—এটাই আমাদের প্রচেষ্টা এবং প্রত্যাশা।