'কওমি সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ ১৩ দফা দাবি' 

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

শিক্ষাখাতে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ ১৩ দফা শিক্ষা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস। 

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে আয়োজিত জাতীয় ছাত্র কনভেনশনে এসব দাবি জানানো হয়।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলীর সভাপতিত্বে কনভেনশনে প্রধান অতিথি ছিলেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন খেলাফত মজলিস মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আখম ইউনুস, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ছাত্র মজলিসের ১৩ দফা শিক্ষা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে তা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরে কুরআন ও প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করুন। ছাত্রীদের জন্য আলাদা শিফটে ক্লাস গ্রহণ এবং গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ চালু করুন। আগামী অর্থবছর থেকেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। সরকারি নিয়োগসহ সকল পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ এবং মেধার মূল্যায়ন করুন। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কওমি মাদরাসা সনদের স্বীকৃতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করুন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এসব অবিলম্বে এসব বাস্তবায়ন দেখতে চায়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। আমাদের আগামী প্রজন্মের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে যে কোনো মূল্যে সুরক্ষা দিতে হবে।’

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাওলানা বাছিত আজাদ বলেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান অর্জন, বিবেক ও চিন্তাশক্তির বিকাশ সাধন এবং এর মাধ্যমে নৈতিক গুণাবলি সম্পন্ন মানবিক ও দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলা। শিক্ষা শুধু পার্থিব কল্যাণ নয় বরং পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশনাও দেয়, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলে। কিন্তু আমাদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় আজ ইসলামি মৌলিক শিক্ষা অনুপস্থিত। এই বহুধারায় বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অন্যতম অন্তরায়।’

এসময় গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করায় সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকার সংবিধান সংশোধন কমিশন গঠনের মাধ্যমে গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করেছে। জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সংবিধানের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েমের সকল পথ রুদ্ধ করতে এবং জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে করতে হবে। আমরা সরকারকে গণরায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

সভাপতির বক্তব্যে ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ রায়হান আলী বলেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে প্রথম ওহি অবতীর্ণ করে ঘোষণা করেছেন, পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম শিক্ষার ভিত্তি দিয়েছে স্রষ্টার পরিচয় ও নৈতিকতার উপর। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে সরিয়ে এক সেক্যুলার ও ভোগবাদী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যে শিক্ষা মানুষকে খোদাভীরু বানায় না, যে শিক্ষা চরিত্রবান মানুষ গড়ে না, তা দিয়ে কখনো একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘ছাত্র মজলিসের কালজয়ী স্লোগান “জ্ঞান অর্জন, চরিত্র গঠন ও সমাজ বিপ্লবের জিহাদে শরিক হোন”— নিছক পার্থিব স্লোগান নয়; এটি কোরআনিক নির্দেশনা ও নববী আদর্শের সরাসরি প্রতিফলন। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সমাজে জাহেলিয়াত ও ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখনই সত্যের কাফেলা রুখে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই শাহবাগ চত্ত্বর থেকে আমাদের শপথ নিতে হবে— বাতিলের সমস্ত ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে কোরআনের আলোকে আগামীর প্রজন্মকে গড়ে তুলব। জুলুম, দুর্নীতি ও অন্যায়ের সাথে আমাদের কোনো আপস নেই।’

সেক্রেটারি জেনারেল জাকারিয়া হোসাইন জাকিরের সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন খেলাফত মজলিস নায়েবে আমির  মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন, মুহাম্মদ মুনতাসীর আলী, ছাত্র মজলিস সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা জয়নুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল জলিল, মুহাম্মদ আব্দুল করিম, তাওহীদুল ইসলাম তুহিন, এডভোকেট শায়খুল ইসলাম, প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরু, মাওলানা সোহাইল আহমদ, মাওলানা আজিজুল হক, মাওলানা মনির হোসাইন, খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান, মুহাদ্দিস শেখ সালাহ উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাওলানা আজিজুল হক, খেলাফত মজলিস ঢাকা মহানগরী উত্তর সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা সাইফ উদ্দিন আহমদ খন্দকার, শ্রমিক মজলিস সাধারণ সম্পাদক এইচএম এরশাদ প্রমুখ।

ছাত্র কনভেনশন উদ্বোধন করেন নাস্তিক মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ও ছাত্র মজলিস কর্মী আরমানের বড় ভাই মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান। ভাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী, ন্যাশনাল ওলামা এ্যালায়েন্স সভাপতি মাওলানা আশরাফ মাহদী, জাস্টিস এন্ড ডেমোক্রেসি পার্টি সভাপতি নাঈম আহমদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ সহসভাপতি খাইরুল আলম মারজান, ইসলামী ছাত্র সমাজ মহাসচিব মুহাম্মদ ঈসা খান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র ঐক্য সভাপতি মুহাম্মদ সাব্বির আহমদ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ও ক্যাম্পাস সম্পাদক ইসমাইল খন্দকার, বায়তুলমাল সম্পাদক আহসান আহমাদ খান, অফিস সম্পাদক নূর মোহাম্মদ, ছাত্রকল্যাণ ও মাদরাসা কার্যক্রম সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এইচ এম শাহাব উদ্দিন, কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমদ, পরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমী, পরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী সভাপতি মুহিবুর রহমান রায়হান, পরিষদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগর সভাপতি ইকরামুল হক প্রমুখ।

জাতীয় ছাত্র কনভেনশন শেষে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব অতিক্রম করে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেইটে শেষ হয়।

ছাত্র মজলিসের ১৩ দফা শিক্ষা দাবি
১. শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরে কুরআন ও প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

২. প্রতিটি ক্যাম্পাসে ধর্মীয় অনুশাসন পালন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে।

৩. সেশনজট নিরসন, নিয়োগসহ সকল পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ এবং মেধার মূল্যায়ন করতে হবে।

৪. ক্যাম্পাসে হল দখল, সিট বাণিজ্য, র‍্যাগিং কালচারসহ চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি বন্ধ করতে হবে।

৫. শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে শিক্ষা ফি, কাগজ, কলম ও বইসহ সকল শিক্ষা উপকরণের দাম কমাতে হবে।

৬. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. শিক্ষা খাতে দেশের মোট জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে।

৮. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রীদের জন্য আলাদা শিফটে ক্লাস গ্রহণ এবং গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ চালু করতে হবে।

৯. বেকারত্ব নিরসনে কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা চালু করতে হবে।

১০. প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি আলিয়া মাদরাসা এবং কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।

১১. প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করতে হবে।

১২. বেসরকারি শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি অনুদান বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

১৩. পাঠ্যবইয়ে ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী লেখা বাতিল করতে হবে।