এক ব্যাগ রক্তে বাঁচে দুটি প্রাণ
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:১৬ | অনলাইন সংস্করণ
নাসির বাবু

বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান । বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে রয়েছে বিজ্ঞানের অবিস্মরণীয় সাফল্য। পাশাপাশি রয়েছে কিছু ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা। যেমন, বিজ্ঞানের বহু অগ্রগতি সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা এখনো কৃত্রিম উপায়ে ব্যবহার উপযোগী রক্ত তৈরি করতে সক্ষম হননি। এ কারণে মিল কারখানা বা ফ্যাক্টরিতে রক্ত উৎপাদন করা যায় না, শুধু এবং শুধু মানব রক্তের একমাত্র উৎস মানুষ। আর এই রক্তই মানুষের বেঁচে থাকার অনস্বীকার্য উপাদান। হঠাৎ দুর্ঘটনা, সন্তান প্রসব, থ্যালাসেমিয়া, ক্যান্সার সহ নানাবিধ জটিল অপারেশনে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক রক্তের জোগানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদানে খুব বেশি আগ্রহী নয়। অথচ এক ব্যাগ রক্ত একজন মানুষকে নতুন করে পৃথিবী দেখাতে পারে। একটি নবাগত সন্তানকে মাতৃহারা হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। কোন কোন ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময়ে রক্তের জোগান না পাওয়ায় বাচ্চা ডেলিভারি বিলম্বিত হয়। ফলে মা ও শিশু উভয়েই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে। ক্ষেত্র বিশেষে রোগীর মৃত্যুও ঘটে।
সমগ্র পৃথিবীতে বার্ষিক আট কোটি ইউনিট রক্ত স্বেচ্ছায় দান হয়। যার মাত্র ৩৮ শতাংশ আসে উন্নয়নশীল দেশ থেকে। অথচ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ বাস করে উন্নয়নশীল দেশে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের ন্যায় স্বেচ্ছায় রক্তদানে বাংলাদেশও অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। বার্ষিক ১৪ লক্ষ টন রক্তের চাহিদা থাকলেও মাত্র ৩১ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদান থেকে। এর পিছনে মূল কারণ অসচেতনতা, ভয় ও সামাজিক কুসংস্কার। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে রক্তদান করলে নিজের দেহে রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বাঁধাও কাজ করে। অনেকেই মনে করে মুসলিম হয়ে হিন্দু বা হিন্দু হয়ে মুসলিম কাউকে রক্তদান করলে তাঁর পাপ হবে। অথচ মানব ধর্মই মানুষের মূখ্য পরিচয় হওয়া উচিত। তাই তো কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, “কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভিতরে সবারই সমান রাঙা”। অর্থাৎ সাদা-কালো ,জাত-পাত, ধর্ম -বর্ণ বৈষম্য থাকলেও সকলের দেহে একই রঙের রক্ত প্রবাহমান। কবি চন্ডীদাস বলেছেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”। একজন মানুষের আসল পরিচয় তিনি মানুষ। মানবতার মূল্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ সবকিছুর উর্ধ্বে ।
রক্তদানের ক্ষেত্রে কখনো কখনো পারিবারিক বাঁধাও মূখ্য কারণ হয়ে ওঠে। কেননা অনেক অভিভাবক এখনো অসচেতন, তারা মনে করে রক্তদান করলে শরীরে দূর্বলতা দেখা দেয়, মাথা ঘুরায় ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়। অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে কিছু সময়ের জন্য এরকম অনুভুতি সৃষ্টি হলেও খুব দ্রুত আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। প্রত্যেক সুস্থ সবল মানুষের বছরে অন্তত একবার শরীর চেক আপ করানো উচিৎ। অথচ আমরা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন। প্রতিবার রক্তদানের সময় রক্তদাতাকে বাধ্যতামূলক রক্ত ও আনুষঙ্গিক কিছু পরিক্ষা করাতে হয় তাও সেটা বিনামূল্যে। অর্থাৎ একজন রক্তদাতা তিনি শুধু একজন মানুষের জীবন রক্ষা করছেন না, সাথে নিজের জীবনও বাঁচাচ্ছে। আজকাল পৃথিবীতে সুখী মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝার উত্তম স্থান হাসপাতাল। একজন সুস্থ সবল অসুখী মানুষ কিছু সময়ের জন্য হাসপাতালে অবস্থান করলে তিনিও নিজেকে সুখী অনুভব করবেন। রক্তদানের ফলে একজনের মুমূর্ষু রোগী ও তার পরিবারের মুখে যে হাসি ফোটে তা হয়তো শতকোটি টাকায় কেনা সম্ভব নয়। তাই তো পল্লী কবি জসীম উদ্দিন বলেছেন “সবার সুখে হাসবো আমি, কাঁদবো সবার দুঃখে”। অপরের ভালো থাকার মাঝেও নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া যায়। কাজেই মানুষ হিসেবে আমরা যখন অপরের দুঃখে দুঃখী হতে পারবো কেবল তখনই মানব সত্তা সার্থকতা পাবে।
একজন সুস্থ সবল মানুষ গড়ে বছরে তিন বার রক্ত দিতে পারে। মানুষের রক্তে লোহিত রক্তকণিকার আয়ুস্কাল প্রায় ১২০ দিন বা চার মাস। অর্থাৎ প্রতি চার মাস পরপর লোহিত রক্তকণিকার ধ্বংস হয়ে নতুন করে জন্ম নেয়। অথচ রক্তদানের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই মানুষের দেহে নতুন রক্তকণিকা জন্ম নেয়। পক্ষান্তরে মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দেহে রক্তের ঘাটতি পূরণ হয়। কাজেই রক্তদানের ফলে দাতার দেহে রক্তের কোন ঘাটতি হয় না। বরং রক্তের লোহিত রক্তকণিকা আরো বেশি উজ্জীবিত হয়। রক্তদানের ফলে রক্তদাতার দেহের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও অনেকাংশে হ্রাস পায়। কাজেই রক্তদানে ভয় নয় , সুন্দর মানসিকতাই পারে একজন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। একটি নতুন শিশু তথা ফুলের জন্ম দিতে।
মানুষ সামাজিক জীব, প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ভাবে সমাজের অন্যান্য মানুষের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে রক্তের কোন বিকল্প না থাকায় এক্ষেত্রে সম্পূর্ণরুপে মানব নির্ভর। অনেক সময় সমাজের অনেক মানুষ শত্রু ভাবাপন্ন থাকলেও রক্তদানের মাধ্যমে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। কেননা মানুষের সকল ঋণ পরিশোধ করা যায় কিন্তু জীবনের মূল্য কখনো পরিশোধ হয় না। কাজেই রক্ত গ্রহীতা ও তার পরিবার আজীবন ঋণী থাকে। ফলে সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো দৃঢ় ও মজবুত হয়। উভয়ের মাঝে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এজন্য প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজে রক্ত দেয়া, অন্যকে রক্তদানে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি সমাজ, পাড়া, মহল্লা ও গ্রামে ব্লাড ব্যাংক গড়ে তুলতে সহায়তা করা। যাতে জরুরি মুহূর্তে খুব সহজেই রক্ত পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের পুরুষের তুলনায় নারী বেশি থাকলেও রক্তদানে নারীদের ভূমিকা তেমন পরিলক্ষিত হয় না। অথচ বর্তমানে নারীরা পুরুষের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকার মূল কারণ ভয়, পারিবারিক বাধা ও কুসংস্কার। রক্তদানে সকল কুসংস্কার ও বাঁধাকে দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশই তরুন। যাদের অধিকাংশই স্কুল, কলেজ, মাদরাসা অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এদেশের তরুণ সমাজ যথেষ্ট উদ্যমী ও সাহসী। সুতরাং তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের কে এ ব্যাপারে আরো বেশি সচেতন করা উচিত। একই সাথে শহরের ন্যায় গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রক্তদান সংগঠন গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অথচ দুঃখের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত যে সকল রক্তদানের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠেছে যথেষ্ট ফান্ডিং ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা অনেক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজনে সরকারিভাবে বাৎসরিক কিছু অর্থায়ন বা আনুষঙ্গিক সাহায্য সহযোগিতা করা উচিত। এতে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আরো বেশি তরান্বিত হবে। গ্রামাঞ্চলে রক্তদানের উপকারিতা বোঝাতে বিভিন্ন সভা সেমিনারের আয়োজন ও রক্তদাতাদের উক্ত অনুষ্ঠান ও সভা সেমিনার এর মাধ্যমে সম্মানিত করলে মানুষ এ ব্যপারে আরো বেশি সচেতন ও আগ্রহী হয়ে উঠবে। পরিশেষে বলা যায়, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগই পারে নিভে যাওয়া চোখে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি নতুন প্রানের সঞ্চার ঘটাতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
nasirbabu856@gmail.com
