খাদ্য মানুষের জন্য অধিকার অনুগ্রহ নয়

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

  নজরুল ইসলাম

প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, সবার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করা হয়। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃষি উৎপাদনের অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবীর বহু মানুষ এখনো ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্যসংকটে ভুগছে। বাংলাদেশেও খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট, পুষ্টিহীনতা এবং নিরাপদ খাদ্যের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তাই বিশ্ব খাদ্য দিবসের তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে খাদ্যব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও খামারিরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দেন। ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি, মাছ, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে খাদ্য থাকতে হবে, খাদ্য হতে হবে পুষ্টিকর ও নিরাপদ এবং সারা বছর তার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

বাজারে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজির দাম সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেলে খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে দিনমজুর, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে।

খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে কৃষকের স্বার্থও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পেলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাব, সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে অনেক সময় উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কৃষক কম দাম পেলেও বাজারে ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। এ বৈপরীত্য দূর করতে কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা আধুনিকায়ন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ, সমবায়ভিত্তিক বিপণন এবং গ্রামীণ সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, সাশ্রয়ী সেচসুবিধা ও কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আরেকটি বড় হুমকি। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খরা ও সেচসংকট, নদীভাঙন এবং আকস্মিক বন্যা কৃষকের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, কৃষি গবেষণা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে উর্বর জমি কমে যাওয়া রোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যের প্রাপ্যতার পাশাপাশি পুষ্টির বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। শুধু ভাত খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব হলেও শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য। কিন্তু আয় কম হওয়া এবং পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মাছ, ডিম, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজি নিয়মিত কিনতে পারে না। এ সমস্যা সমাধানে বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টি কার্যক্রম, মা ও শিশুর পুষ্টিসেবা, পুষ্টি সম্পর্কে জনসচেতনতা এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় খাদ্যের অপচয়। উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। অপর্যাপ্ত হিমাগার, উপযুক্ত প্যাকেজিংয়ের অভাব এবং অসচেতন ভোগের কারণে এই অপচয় বাড়ে। অথচ অপচয় কমানো গেলে অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে এবং খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়বে। এ জন্য কৃষিপণ্যের আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, উদ্বৃত্ত নিরাপদ খাদ্য পুনর্বণ্টন এবং পরিবার ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দায়িত্বশীল খাদ্য ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অপব্যবহার এবং অনিরাপদ খাদ্য বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো মানুষ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, কোনো শিশু যেন অপুষ্টির শিকার না হয় এবং কৃষকের শ্রম যেন ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারকে খাদ্য উৎপাদন, বাজার নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি গবেষণায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হতে হবে, কৃষককে দিতে হবে প্রাপ্য মর্যাদা এবং নাগরিকদেরও খাদ্যের অপচয় রোধে সচেতন হতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা কেবল কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, বাজার ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।

ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, সাশ্রয়ী মূল্য, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। বিশ্ব খাদ্য দিবসের শিক্ষা হোক বাস্তব কর্মসূচিতে প্রতিফলিত। খাদ্য মানুষের অধিকার, অনুগ্রহ নয়—এই নীতিকে সামনে রেখে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও খাদ্যবৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই গড়ে উঠবে সুস্থ, সক্ষম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ক্ষুধা দূরীকরণ, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় করার জন্যপ্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজচিন্তক

nazrulnews1970@gmail.com