দরজা খুলছে, এখন জট খোলার পালা
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

সোমবারের সকালটা আজ বেশ আশাবাদী মুখ করে এসেছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের সমঝোতা, আর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ১০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ টানার আয়োজন—দেখে মনে হয় বাংলাদেশ দরজায় কড়া নাড়ার কাজটি বেশ ভালোই শিখেছে। এখন শুধু দরজাটা খুলতে হবে। পায়রায় জাহাজ আসবে, ডিজিটালে পুঁজি আসবে—কিন্তু প্রকল্পের ফাইল যদি টেবিল থেকে টেবিলে এমন ভ্রমণ করে যে শেষে তার নিজেরই পাসপোর্ট দরকার হয়, তাহলে বিপদ। উন্নয়নকে এবার কাগজের জীবন থেকে ইট-পাথরের জীবনে আনতে হবে। উন্নয়নকে এবার কাগজের জীবন থেকে ইট-পাথরের জীবনে আনতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়েও সরকারের বার্তা আজ বেশ পরিষ্কার—দেশের পরিস্থিতি অবনতি করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। কঠোরতা অবশ্য ঘোষণায় বেশ সুদর্শন; তার আসল সৌন্দর্য দেখা যায় প্রয়োগে। এর মধ্যেই মিরপুরে একটি স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তার এবং আরও কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানোর খবর সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচিত। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলীয় রুটে টিকিটবিহীন যাত্রী আর কিছু অসাধু রেলকর্মীর যোগসাজশে রাজস্ব ফাঁকির ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ একদিকে মানুষ টিকিট কাটছেন, অন্যদিকে কেউ কেউ টিকিটের টাকাকে নিজের পারিবারিক বাজেটের সদস্য বানাচ্ছেন—এই পুরোনো রোগটির চিকিৎসা এবার একটু নিয়মিত হওয়া দরকার। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বড় কথা; কিন্তু রেলগাড়ির দরজায় তার ছোট্ট পরীক্ষাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
অর্থনীতির খাতায় অবশ্য আজ একটু ভ্রূকুটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে ২৯৪.৫৬ মিলিয়ন ডলার, অথচ পুরোনো ঋণের মূল ও সুদ পরিশোধ করেছে ৬৯৮.৯২ মিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ নতুন অতিথি যত টাকা নিয়ে এসেছেন, পুরোনো অতিথির বিদায়-খরচ তার দ্বিগুণেরও বেশি। সম্পাদকীয় আলোচনায় তাই প্রকল্পজট নিয়ে যথার্থই প্রশ্ন উঠেছে: বিদেশি ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু প্রকল্পের ধীরগতি ও আমলাতান্ত্রিক জট খুলতে না পারলে বিদেশি ঋণ শুধু ব্যয়ের বোঝাই বাড়াবে। আর মফস্বলের কোটচাঁদপুর থেকে বেড়া—অকার্যকর পানি শোধনাগারের কারণে মানুষ যদি নিরাপদ পানির বদলে আর্সেনিক-আয়রনের সঙ্গে প্রতিদিনের বন্ধুত্ব করতে বাধ্য হয়, তবে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় হিসাবটি এখনও খাতার বাইরে পড়ে আছে।
আন্তর্জাতিক আকাশেও মেঘ কম নয়। অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ইসরায়েলের পাঁচটি প্রধান বিরোধী দল নেতানিয়াহুকে সরাতে সমন্বিতভাবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে; আর হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় তেহরান আলোচনার বার্তা পাঠিয়েছে। পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো যখন তেলের দাম, সমুদ্রপথ আর ক্ষমতার অঙ্ক কষছে, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোরও ক্যালকুলেটর হাতে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই—কারণ হরমুজের জলরাশি শেষ পর্যন্ত আমাদের বাজারের তেলের দামে ঢেউ তোলে।
তাই আজকের বার্তার সারকথা খুব গুরুগম্ভীর করে বলার দরকার নেই: বাংলাদেশের সামনে এখন দরজা খোলারও কাজ আছে, জট খোলারও কাজ আছে। পায়রায় বন্দর হবে, ডিজিটালে বিনিয়োগ আসবে, আইনশৃঙ্খলা শক্ত হবে—এটাই প্রত্যাশা। তবে উন্নয়নের ফাইল যেন উন্নয়নের চেয়ে বেশি ভ্রমণ না করে, ঋণের টাকা যেন প্রকল্পের অপেক্ষায় বসে থেকে সুদ না গোনে, আর নাগরিক যেন নিজের রাষ্ট্রীয় অধিকার পেতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে জীবন পার না করেন। রাষ্ট্রের বড় স্বপ্নের সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ শেষ পর্যন্ত ছোট মানুষের স্বস্তি—সকালে ট্রেনে উঠে টিকিট কেটে নিশ্চিন্তে বসতে পারা, কল খুলে নিরাপদ পানি পাওয়া, আর সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় মনে হওয়া—দেশটা সত্যিই একটু একটু করে ঠিক জায়গায় যাচ্ছে।
