শিক্ষিত বেকার : প্রবৃদ্ধির আড়ালে বড় সংকট
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
জান্নাত আক্তার শিলা

বেকার শব্দ বহনকারী শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের সমাজের কাছে সবচেয়ে লজ্জাজনক পরিচয় বহন করতে হয়। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর আমাদের দেশের তরুণ-তরণীদের নতুন পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় বেকার। বাংলাদেশের পাবলিক, প্রাইভেট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বের হয়। তারপর চাকরির বাজারে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়, ভোগেন নিজের পরিচয় সংকটে। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রীধারীর মধ্যে ৫২ জনই বেকার। বাংলাদেশ ব্যুরো বিবিএসের হিসেবে বাংলাদেশে এখন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪৫ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবছর দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০১৪ সালের আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন(আইএলও) এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর কর্ম বাজারে প্রবেশ করে প্রায় ২৭ লাখ তরুণ তার মধ্যে চাকরি পাচ্ছে ১ লাখ ৮৯ হাজার অর্থাৎ মাত্র ৭ শতাংশ। লেবার ফোর্স সার্ভে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী স্নাতক বা ডিগ্রি সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৬.৭ শতাংশ।
এক দশকের পর সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। দেশের সাধারণ বেকারত্বের হার ৫ শতাংশ হলেও স্নাতক বা ডিগ্রি সনদপ্রাপ্তদের বেকারত্বের হার ১৩.৫০ শতাংশ। প্রতি বছরই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। তরুণ সমাজের হতাশার সবচেয়ে বড় কারণ দেশের চাকরির বাজারে সংকোচন। বেকার তরুণ সমাজ না পারছে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে না পরিবারকে খুশিতে রাখতে আর না পারছে দেশের অর্থনীতিতে অবধান রাখতে। ফলে নিজের ভবিষ্যতের আশঙ্কায়, পারিবারিক ও সামাজিক চাপে ডিপ্রেশন ও হতাশায় ভুগছে। বেকারত্ব শুধু অভাবের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকে না, তরুণদের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। ফলে অনেকে মাদকাশক্ত হয়ে ছিনতাই, চুরি -চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ সাইবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া কেউ কেউ তীব্র মানসিক চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের পথে বড়বাধা হলো বেকারত্ব। তরুণ সমাজকে বাদ রেখে একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বেকার সমস্যা কোনো একক সমস্যা নয় বরং এর কারণে সৃষ্টি আরও বহুবিধ সমস্যা ও অপরাধমূলক কাজ। যা ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও জাতীয় জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তরুণদের মধ্যে উচ্চ হারে বেকারত্ব, হতাশা ও উৎকণ্ঠা যেকোনো সমাজের জন্য হুমকিস্বরুপ। তাদের সঠিকভাবে কাজে না লাগাতে পারলে দেশের শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ থেকে দেশ ও অর্থনীতি কোনো সুফল পাচ্ছে না। ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়ছে। বেকারত্ব সাধারণত তিন ধরনের। প্রথমত, সামঞ্জস্যহীনতাজনিত বেকারত্ব যা শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকলে সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব। উত্তর ও হাওর অঞ্চলে এই ধরনের বেকারত্ব বেশি দেখা যায়। তাছাড়া শিল্পকারখানা ও সেবাখাতে দক্ষ জনশক্তির অভাবেও সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি মন্দাভাব-এর কারণেও বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ে কমে যা বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির পরিবর্তনের জন্য বেকারত্ব দেখা দেয় কাঠামোগত বেকারত্ব বলে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কম, একাডেমিক পড়াশোনায় আবদ্ধ থাকা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব, কারিগরী শিক্ষা গ্রহণ না করা, সরকারি চাকরির জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা, চাকরির বাজারে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, নতুন কর্মসংস্থান সংকীর্ণতা ছাড়াও আরও নানাবিধ কারণে বেকারত্ব সমস্যা দেখা যায়। বিশ্বের কোন দেশই বেকারত্বের সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। উন্নত দেশগুলোতেও তরুণদের বেকারত্বের সমস্যা অনেক সৃষ্টি হয়। তবে অনেক উন্নত দেশে এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিশেষ নীতিমালা রয়েছে যা ‘অ্যাকটিভ লেভার মার্কেট পলিসি’ নামে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ এবং শ্রমবাজারে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের ব্যবস্থা।
উক্ত নীতিমালার উপর যেসব দেশ জোর দিয়েছে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেসব দেশের বেকারত্ব অনেকাংশে কমে এসেছে। বেকারত্বকে এককভাবে নয় সামাজিকভাবে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে সম্পূর্ণ কাজে লাগানো যাবে এমন নয় তবে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে বেকারত্ব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত,শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নে পাঠ্যক্রমে বাস্তবজ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভরতা ভিত্তিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে। তবে পড়াশোনার সাথে সাথেই তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাগ্রহণ। টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের (ঞঠঊঞ) এর অভাবের কারণেই তরুণরা কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত নয়। তাই প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং বৃদ্ধি পেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত দক্ষতার উন্নয়ন। বর্তমানে প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বের তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আইসিটি খাতে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ, এআই, ডাটা এনালাইসিস ও সাইবার বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারে নিজের অবস্থান তৈরির অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ঘরে বসেই আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। চতুর্থত, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলায় সঠিক পরামর্শ, স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজে নিজেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশে প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ তরুণ প্রবেশ করে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে এর তুলনায় নতুন পদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। পঞ্চমত শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে সরকারি ও বেসরকারিভাবে শিল্পায়ন, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও উত্তরাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং স্নাতক পর্যায়ে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণ বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষিত বেকারত্বের হার অনেক বেশি। কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বাড়বে।
ষষ্ঠত, চাকরির বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে হবে। চাকরির পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় স্বল্পতা দূর করে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না আসা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব এবং নিয়োগে স্বজনপ্রীতি তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ায়। স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার চালু করা গেলে তরুণরা পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার সিংহভাগই তরুণ। যাদের হাত ধরে নির্মিত হবে আগামীর উন্নত, সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশ। তাই তরুণ সমাজকে শুধু নাগরিক হিসেবে নয় বরং দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে তরুণ শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশে পরিণত হবে। দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা, উদ্যোক্তা সহায়তা, শিল্পায়ন এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার সমন্বয়ে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি সম্ভব এবং সেই মুক্তিই দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
Email:shilakhan09765@gmail.com
