বর্তমান সময়ের কাঠামোগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের নগর ভবিষ্যত

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ বিপর্যয়

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

  সাকিফ শামীম:

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে নগরায়ণ ছিল উন্নয়নের সমার্থক, একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এসে তা বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের সাম্প্রতিকতম পরিসংখ্যান ও স্যাটেলাইট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের নগর পরিকল্পনা এখন আর কেবল কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি গভীর পরিবেশগত বিপত্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট বহুমুখী সংকট এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশ দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশের জিডিপি-র প্রায় ৫.২ শতাংশ প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে আমাদের উন্নয়নের একটি বড় অংশই পরিবেশগত ক্ষতির মাশুল দিতে গিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেগাসিটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে পৌঁছে গেছে, যা শহরের বাস্তুসংস্থানিক ধারণক্ষমতার (Ecological Carrying Capacity) কয়েক গুণ বেশি। এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামলাতে গিয়ে শহরের ল্যান্ড ইউজ এফিসিয়েন্সি বা ভূমি ব্যবহারের কার্যকারিতা গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (DAP) ২০২২-৩৫-এর ম্যাপ এবং ২০২৪ সালের ফলো-আপ সার্ভে অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৭৪ শতাংশ জলাভূমি ও নিচু জমি ইতোমধ্যে কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছে। এর ফলে শহরের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ভূ-গর্ভস্থ পানিস্তর ক্রমশই নিচে নেমে যাচ্ছে। এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য ঢাকাকে অবিলম্বে ডিসেন্ট্রালাইজ বা বিকেন্দ্রীকরণ করা অপরিহার্য। প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুগুলো ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যান্য ছোট শহরগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় সচেতন ‘কমিউনিটি বিল্ড আপ’ বা এলাকাভিত্তিক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যারা স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখবে।

বায়ু দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন ঢাকার নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন সঙ্গী। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইকিউএয়ার (IQAir)-এর রিয়েল-টাইম ডাটা অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্বের দূষিত বাতাসের তালিকায় বারবার শীর্ষে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে গড়ে ১৭ গুণেরও বেশি পাওয়া গেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের সর্বশেষ ইনডেক্স নির্দেশ করছে যে, এই বিষাক্ত বাতাসের কারণে নগরবাসীর গড় আয়ু প্রায় ৬.৮ বছর কমে যাচ্ছে। এর বাইরেও শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি একটি কারিগরি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসের তাপপ্রবাহের সময় দেখা গেছে যে, ঘনবসতিপূর্ণ এবং গাছপালাহীন এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি ছিল। এই ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব কেবল নাগরিক অস্বস্তি বাড়াচ্ছে না, বরং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তির অপচয় এবং কার্বন নিঃসরণকেও বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নাসা (NASA)-র স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে ২০২৪ সালে করা একটি বিশ্লেষণ বলছে, ঢাকার সবুজ আচ্ছাদন বা গ্রিন কাভার বর্তমানে মোট আয়তনের মাত্র ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা একটি টেকসই শহরের জন্য প্রয়োজনীয় ২৫ শতাংশের তুলনায় অতি সামান্য। এই পরিস্থিতিতে শহরের প্রতিটি মহল্লায় এলাকাভিত্তিক সচেতন কমিউনিটি গড়ে তোলা জরুরি, যারা সবুজায়ন এবং স্থানীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে।
শহরের পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভূ-গর্ভস্থ স্তরের পতন এখন একটি নীরব দুর্যোগের রূপ নিয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ২০২৪ সালের হাইড্রো-জিওলজিক্যাল সমীক্ষা বলছে, ঢাকার একুইফার বা ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বছরে ২.৮ মিটার হারে নিচে নামছে। এবং এই স্তর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটারের বেশি নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শহরের মাটির নিচে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা বড় ধরনের ভূমিকম্পের সময় ‘ল্যান্ড সাবসিডেন্স’ বা ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকিকে ত্বরান্বিত করবে। সাম্প্রতিককালে ভূমিকম্পের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তাই বিদ্যমান ভবনগুলোকে দ্রুত রিস্ট্রাকচার বা শক্তিশালী করতে হবে এবং নতুন যে ভবনগুলো নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোতে কঠোরভাবে এমন প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা অন্তত ৮ মাত্রার সমপরিমাণ ভূমিকম্প সহন করতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলোকে সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, সামান্য বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতার যে দৃশ্য আমরা দেখি, তা মূলত ভূ-পৃষ্ঠের পানি শোষণ ক্ষমতা হারানোরই বহিঃপ্রকাশ। বর্ষা মৌসুমে ঢাকার ড্রেনেজ সিস্টেম ঘণ্টায় মাত্র ১০-১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নিষ্কাশনের সক্ষমতা রাখে, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন স্বল্প সময়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শহরের অভ্যন্তরে টিকে থাকা অবশিষ্ট ২৬টি খালও এখন ময়লা-আবর্জনা ও দখলের কারণে পানি প্রবাহে প্রায় অক্ষম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (BIP)-এর ২০২৪ সালের গবেষণা বলছে, এই জলাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় এবং যানজটের তীব্রতা বাড়ায় বছরে জাতীয় অর্থনীতির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

শিল্পায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রাকে আরও ঘনীভূত করছে। বাংলাদেশের নগরগুলোতে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৩০,০০০ মেট্রিক টন বর্জ্যের একটি বিশাল অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় নদী ও জলাশয়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ট্যানারি ও টেক্সটাইল ডাইং কারখানা থেকে নির্গত ভারী ধাতু যেমন ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম এবং সিসা বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তলদেশে স্তূপীকৃত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, যা জলজ প্রাণের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে প্রতিটি কমিউনিটিতে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সটিংগুইশার এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সেট করতে হবে। স্থানীয় অধিবাসীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া ল্যান্ডফিল্ডগুলোতে উন্মুক্ত অবস্থায় বর্জ্য পচনের ফলে নির্গত মিথেন গ্যাস গ্রিনহাউস প্রভাবকে তীব্রতর করছে, যা বাংলাদেশের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বা এনডিসি (NDC) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরায়ণের এই নেতিবাচক প্রভাব পাহাড় এবং বনভূমির ওপরও সমানভাবে পড়ছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে আবাসন প্রকল্পের নামে পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের বর্ষা মৌসুমেও ভয়াবহ ভূমিধস ও প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

তাই ২০২৫ সালের এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। কেবল বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তা বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করে এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন ‘স্পঞ্জ সিটি’ কনসেপ্টের মতো বৈজ্ঞানিক সমাধান, যেখানে পার্সেবল পেভমেন্ট এবং গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানিকে সরাসরি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিকেন্দ্রীকরণ না করা হলে ঢাকার ওপর এই জনসংখ্যার চাপ কমানো অসম্ভব। জাতীয় পরিকল্পনায় ‘স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের মতো আধুনিক উদ্যোগগুলোকেও স্থান দিতে হবে। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে, যদি আমরা এখনই পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাকে সমন্বিত না করি, তবে আগামী কয়েক বছর নাগাদ বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থায়ীভাবে ২-৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। উন্নয়নের টেকসই রূপরেখা বাস্তবায়নে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ভূমি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিসর্জন দিয়ে যে নগরায়ণ, তা দীর্ঘমেয়াদে কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে। আমাদের শহরগুলোকে পুনরায় বাসযোগ্য করতে হলে পরিবেশগত পুনরুদ্ধারকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।


 লেখক : ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ।

আমার বার্তা/সাকিফ শামীম/এমই