পোশাক খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর বিষয়ক ইইউ-সুইডিশ দূতাবাস আলোচনা অনুষ্ঠিত
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১১ | অনলাইন সংস্করণ
রানা এস এম সোহেল

* ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করা এবং বাংলাদেশকে একটি পছন্দের বৈশ্বিক পোশাক সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে আলোচনা করতে এইচএসবিসি, এআইআই, সুইডেন দূতাবাস এবং ইইউ প্রতিনিধিদল শিল্প নেতাদের একত্রিত করেছে। *
গত বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে এইচএসবিসি বাংলাদেশ, অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউট (এআইআই), বাংলাদেশে সুইডেন দূতাবাস এবং বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল এই উচ্চ-পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। এতে সরকার, বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ড, উৎপাদক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন অংশীদার এবং শিল্প সমিতি থেকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় অংশীজনরা একত্রিত হন। বাংলাদেশ কীভাবে তার পোশাক শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রাপ্তি ত্বরান্বিত করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এই বৈঠকের উদ্দেশ্য।
“পরিবর্তনশীল জ্বালানি প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের জন্য ডিকার্বনাইজেশনকে এগিয়ে নেওয়া” শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করা হয়। কারণ, বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো ডিকার্বনাইজেশনের দিকে এগোচ্ছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজার ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষী টেকসই ও পরিবেশগত চাহিদা আরোপ করছে।
এই অনুষ্ঠানে একত্রিত হয়েছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মহামান্য মাইকেল মিলার, বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ শাখার প্রধান এ কে এম সোহেল, সুইডেন দূতাবাসের চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্স ওলে লুন্ডিন, এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মো. মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. সারওয়ার হোসেন, বিজিএমইএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা খান, এআইআই-এর ক্রিস্টিনা এলিন্ডার লিলজাস, এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের কিম হেলস্ট্রম এবং এটিটিআই-এর অলিভিয়া উইন্ডহ্যাম স্টুয়ার্টসহ বৃহত্তর টিম সুইডেন নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিরা এবং অন্যান্য শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আলোচনায় এটি স্পষ্ট হয় যে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা কেবল একটি পরিবেশগত অপরিহার্য বিষয়ই নয়, বরং এটি ক্রমবর্ধমানভাবে একটি বাণিজ্যিক ও প্রতিযোগিতামূলক সুযোগও বটে। নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের নবায়নযোগ্য শক্তির বৃহত্তর প্রাপ্যতা উৎপাদকদের নির্গমন ও জ্বালানি খরচ কমাতে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বাজারের প্রত্যাশা পূরণ করতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান পোশাক সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা, শিল্পখাতের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা সমন্বিত একটি মূল অধিবেশনের মাধ্যমে আলোচনাটি সমৃদ্ধ হয়। অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউটের (Aii) ক্রিস্টিনা এলিন্ডার লিলজাস বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদন খাতের ডিকার্বনাইজেশনের অর্থায়নের প্রেক্ষাপট ও সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে Aii-এর গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। গবেষণাটি বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খল জুড়ে নির্গমন হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতে ৫০% ডিকার্বনাইজেশন অর্জনের জন্য ৬.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করে।
এইচএসবিসি হোল্ডিংস পিএলসি-এর গ্লোবাল সাসটেইনেবিলিটির ক্লিন পাওয়ার সিস্টেমস-এর গ্লোবাল হেড র্যান্ডলফ ব্র্যাজিয়ার এবং এইচএসবিসি-এর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর হেড জাস্টিন উ-ও জুমের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য ক্লিন এনার্জির সম্ভাবনা বিষয়ে তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার বলেন, “ইউরোপীয় বাজার এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল যখন একটি স্বল্প-কার্বন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সহজলভ্যতা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উৎপাদন ক্ষমতার সাথে পরিচ্ছন্ন উৎপাদনকে একত্রিত করার একটি সুযোগ রয়েছে, যা আমরা আপনাদেরকে দু'হাত দিয়ে লুফে নিতে উৎসাহিত করছি, যাতে এই দেশকে টেকসই উৎসায়নের ক্ষেত্রে অগ্রভাগে স্থাপন করা যায়।”
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ যখন তার বৈশ্বিক নেতৃত্বকে সুসংহত করছে, তখন জ্বালানি রূপান্তরকে বাণিজ্যিকীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সহায়ক নীতি, সম্প্রসারণযোগ্য প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি পুঁজিকে কাজে লাগানোই হবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি।”
গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তরে সহায়তা করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকটি এই যৌথ স্বীকৃতির মাধ্যমে সমাপ্ত হয় যে, বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। নির্ভরযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সহজলভ্যতা ও প্রাপ্তি ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কার্বনমুক্তকরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতি সাড়া দিতে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং বিশ্বব্যাপী পোশাক সংগ্রহের একটি পছন্দের ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
