বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন এখন স্পষ্টতই শেষ
জন এফ ড্যানিলোভিচ
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৮:৪২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

২০২৪ সালের আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি—সব মিলিয়ে এক জটিল কিন্তু কৌশলগত কূটনীতি পার করছে বাংলাদেশ।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ঢাকার সাবেক মার্কিন ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের বর্তমান ভূ-রাজনীতি, ভারতের সাথে আইনি জটিলতা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে ঢাকার ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: 'ভারতীয় আধিপত্যের' অবসান
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদনের বিষয়টি উঠে আসে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নয়া দিল্লি আশ্রয় দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
ড্যানিলোভিচ মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাস ও ভূগোলের সূত্রে একে অপরের সাথে বাঁধা। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি 'ধীরে কিন্তু সুনির্দিষ্ট' নীতি গ্রহণ করেছে।
"বাংলাদেশে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন এখন স্পষ্টতই শেষ। শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের ভারতে অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। দুই দেশের সরকারই জনগণের এই জনমতকে উপেক্ষা করতে পারবে না।"
একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন অপপ্রচার ও 'মিসইনফরমেশন' ভারতীয় জনমতকেও প্রভাবিত করেছে, যা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর এবং ওয়াশিংটনের ভারসাম্য
বাংলাদেশকে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত করার আলোচনা নিয়ে জোর গুঞ্জন চলছে। এটিকে কীভাবে দেখছে ওয়াশিংটন?
সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিকের মতে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেই হিসেবে চীন একটি বড় বাজার এবং বিনিয়োগের উৎস। মিয়ানমারে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে দেশটির সাথেও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো ঢাকার জন্য স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
তবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ফাটল ধরবে না বলে তিনি আশাবাদী। ড্যানিলোভিচ বলেন, বাংলাদেশ যদি চতুর ও দক্ষ কূটনীতির পরিচয় দিতে পারে, তবে চীনের সাথে এই অর্থনৈতিক যোগাযোগ ওয়াশিংটনের সাথে কোনো বিরোধের কারণ হবে না।
রোহিঙ্গা সংকট ও রাখাইন করিডোর: কৌশলগত ঝুঁকি নাকি মানবিক প্রয়াস
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। ড্যানিলোভিচ মনে করেন, আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে আসায় দীর্ঘ মেয়াদে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে সামলানো অসম্ভব।
তাই রাখাইনে পরিস্থিতি উন্নত করা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকার ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো ঢাকার একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এই করিডোর নিয়ে সমালোচনার অনেকটুকুই ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতি: সার্কের স্থবিরতা ও আসিয়ানমুখী বাংলাদেশ
ভারত ও পাকিস্তানের চিরবৈরী সম্পর্কের কারণে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক পরিধি বাড়াতে আসিয়ান এবং ডি-৮ জোটের দিকে নজর দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আসিয়ানের অংশীদার হওয়ার জন্য জোরালো লবিং শুরু করেছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। ড্যানিলোভিচ বাংলাদেশের এই বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। বিশেষ করে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকার একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন তিনি।
ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ওয়াশিংটন ঢাকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। ড্যানিলোভিচ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশি কমিউনিটি দুই দেশের মধ্যকার জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। - সূত্র: দ্যা ডেল্টাগ্রাম
আমার বার্তা/এমই
