‘আগে লাইন ধরে তেল পেতাম, এখন রাতভর অপেক্ষার পরও মেলে না’

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

ক্লান্ত মুখ আর নিদ্রাহীন চোখ। এ যেন অনিশ্চয়তার ভারে দাঁড়িয়ে থাকা। জ্বালানি তেল পেতে দেরি হবে জেনেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকা। পেট্রোল পাম্পের সামনে এমন দৃশ্য এখন নিয়মিত। জ্বালানি সংকটে চলার একমাত্র ভরসা মোটরসাইকেলটিই এখন একরকম বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে মিজানুর রহমানের কাছে। 

মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি ইমামতি করেন তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনই তাকে ছুটতে হয়। কিন্তু তিনদিন অপেক্ষায় থেকেও তেল না মেলায় প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তার এই বাহনটি। মিজানুর রহমানের মতোই বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটির পর মোটরসাইকেল নিয়ে কুড়িল পিনাক্যাল পাম্পের লাইনে দাঁড়ান রতন সরকার। ভোর ৫টার পর এলেও তার সামনে রয়েছে আরও শতাধিক মোটরসাইকেল।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে তেলের জন্য বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কেউ কেউ রাত ১০টা থেকেই পাম্পে অবস্থান করছেন। কেউ এসেছেন ভোরে। পাম্প কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময় বেঁধে দেওয়ায় যানবাহনে বসেই চালকদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

এদিন সকাল ১০টায় পিনাক্যাল পাম্পে এসে নিজের মোটরসাইকেল খুঁজছিলেন মিজানুর রহমান। হারিয়ে গেছে ভেবে অনেকেই তার কাছে ছুটে যান। একপর্যায়ে দেখেন তার মোটরসাইকেলটি লাইনের বাইরে রাখা। এতে বেশ আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

মিজানুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনটি পাম্প ঘুরেছি তেলের জন্য। ক্লান্ত থাকায় ঠেলে বাসায় নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। পরে কুড়িলের এই পাম্পের লাইনে দাঁড়াতে হয়। রাত ১১টা পর্যন্ত না পেয়ে মোটরসাইকেল রেখেই বাসায় ফিরে যাই। শুক্রবার সকালে তেল দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল পাম্প কর্তৃপক্ষ। কিন্তু গতকাল এসে জানতে পারি দেওয়া হবে না। মাইকেও এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে হতাশ হয়ে বাসায় ফিরে যাই।

তিনি বলেন, আজ এসে দেখি আমার বাইকটি লাইনের জায়গা থেকে সরানো। আবার শুনছি বিকেল ৩টা থেকে তেল দেবে। এখন আবার অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। তবে আগে লাইন ধরে তেল পেতাম। এখন দিনের পর দিন বা রাতভর অপেক্ষা করেও মেলে না। এ ভোগান্তির কথা আমরা কাকে বলবো। কারণ আমাদের কথা শোনার মতো তো কেউ নেই। 

জ্বালানি সরবরাহে অসাম্য রয়েছে বলে অভিযোগ চালকদের। তাদের মতে, পাম্প থেকে আড়ালে তেল বাইরে নিয়ে ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য এত টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। এজন্যই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। অনেকের অভিযোগ, বড় লোকদের লাইনে দাঁড়াতে হয় না। তারা বাসায় বসেই তেল পায়। কারণ ভোগান্তির ভয়ে অতিরিক্ত দামেই তেল কিনে নিচ্ছেন তারা।

চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় রাইড শেয়ারিং করেন মো. হাসান আলী। তিনি এ অপেক্ষাকে সময়ের অপচয় হিসেবে নয়, জীবিকায় আঘাত করছে বলে দাবি করেন। হাসান বলেন, এটা আমার জরুরি বাহন। তেলের জন্যই যদি দিন পার করি, তাহলে আয়-রোজগার করবো কী করে। এতে অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতি হচ্ছে। তাই আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষদের এই ভোগান্তি কমাতে সরকারের আরও ভালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, তেলের সংকট থাকায় নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছেন তারা। কোনো পাম্পে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, আবার কোথাও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তেল বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয় যানবাহন চালকদের।

পিনাক্যাল পাওয়ার লিমিটেডের ম্যানেজার সৈয়দ নুরুল হাসান বলেন, আমাদের পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার লিটার জ্বালানি সরবরাহ আসে, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আগে প্রয়োজনে অতিরিক্ত গাড়ি এনে সরবরাহ বাড়ানো হলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। 

তিনি জানান, বর্তমানে বিকেল ৩টা-৪টার মধ্যে তেল বিক্রি শুরু হয়ে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলে। দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার লিটার হওয়ায় সংকট থেকেই যাচ্ছে। সরবরাহ নিয়ে সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মিল নেই বলে অভিযোগ তার। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটি চক্র গড়ে তুলেছে। যারা পাম্প থেকে তেল নিয়ে মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করছে বলে শোনা যাচ্ছে। 

নুরুল বলেন, বর্তমানে পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের সরিয়ে কিছু লোক জোর করে ঢুকে লাইনে বাইক রেখে দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ একাধিকবার তেল নিয়ে বাইরে সংরক্ষণ করে পুনরায় লাইনে আসছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হলেও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।