“রোজেলা ফুলের পানীয় - এক চুমুকেই সতেজতা” শুরুর কথা

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৫:১৪ | অনলাইন সংস্করণ

  ড. মোছাঃ ফারহানা শারমিন:

রোজেলা  মালভেসি পরিবারের পাটজাতীয় একটি ফসল যার বৈজ্ঞানিক নাম Hibiscus sabdariffa L.। রোজেলা আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল সুদানে প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই চাষ করা হয়। পরবর্তীতে ১৬শ-১৭শ শতকে এটি সুদান থেকে শুরু করে মিশর, পশ্চিম আফ্রিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং এশিয়ার প্রতিটি অঞ্চলে ভিন্ন নামে ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর টক-মিষ্টি স্বাদ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা একে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনপ্রিয় করে রেখেছে। প্রাচীনকালে চুকুরকে ঔষধি উদ্ভিদরূপে  ব্যবহার করা হতো। মিশরীয়রা গরম আবহাওয়া থেকে শরীর ঠান্ডা রাখতে চুকুরের পাতা ও ফুল দিয়ে তৈরি পানীয় ব্যবহার করত। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় বহুকাল থেকে চাষাবাদ হয়ে আসছে এবং এই সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল "চুকুর চুকাই, চুকুরি, মেস্তা" নামেই আমাদের দেশে পরিচিত। জলবায়ু সহনশীলতা, স্বল্প সময়ে ফসল সংগ্রহের সুবিধা এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদনের কারণে রোজেলা বাংলাদেশের মাটিতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সবজি মেস্তা একটি টেট্রাপ্লয়েট উদ্ভিদ যার ক্রোমোজোম সংখ্যা ৭২। 

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) দেশে রোজেলার গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন, আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। বন্য প্রজাতির মেস্তা (এম-৭১৫) থেকে বিজেআরআই এর প্রজনন বিভাগ বিশুদ্ধ সারি নির্বাচন ও গবেষণার মাধ্যমে অধিক ফলনশীল সবজি হিসাবে খাবার উপযোগী সবজি মেস্তা-১ জাতটি উদ্ভাবন এবং জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক ২০১০ সালে বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১) নামে অবমুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পযর্ন্ত মেস্তার ৫টি জাত উদ্ভাবন করেছে। যার মধ্যে ২টি জাত সবজি হিসাবে খারার উপযোগী সেগুলো হলো: বিজেআরআই মেস্তা ২ (সবজি মেস্তা-১) এবং বিজেআরআই মেস্তা ৪ (সবজি মেস্তা-২) । 

বিজেআরআই এর ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগের সিএসও (সিসি) ড. মো. আবুল ফজল মোল্লা ২০১৫ সাল থেকে রোজেলা চাষ জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। যা স্থানীয় পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের স্নাতক শেষবর্ষের ৩ জন শিক্ষার্থী ২০১৭ সালে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে রোজেলা চাষ শুরু করে এবং পরবর্তীতে ক্যালিক্স ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা রোজেলা চা তৈরী করছে। ইয়ং বাংলা আয়োজিত স্টুডেন্ট টু স্টার্ট আপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে ২২৫০ টি টিমের মধ্যে তারা রানার্সআপ হয়েছে ৷ তাদের সফলতার গল্প  বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তারা বলেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কেন্দ্র, রংপুর -এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আবুল ফজল মোল্লা এই মেস্তা পাট চাষে নির্দেশনা দেন এবং সহযোগিতা করার কারণে তারা পাবনার সাঁথিয়াতে প্রথমে ৪ (চার) বিঘা জায়গায় মেস্তা পাট চাষ করে ৩.৫ টন কাঁচা ক্যালিক্স সংগ্রহ করে এবং প্রক্রিয়াজাতের পর প্রাপ্ত ক্যালিক্স ৩২০ কেজি যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১২ লক্ষ টাকা। তারই ধারাবাবিকতায় ড. মোল্লা রোজেলা ফুল সংগ্রহ করেন এবং তা ভালভাবে পরিষ্কার করে  বীজ ফেলে শুকানোর পর তা সংরক্ষণ করেন এবং এই  ‍শুকানো ফল বছরব্যাপী চা তৈরি করে খাওয়া যায়। শুকনা রোজেলা ফুল এক কাপ গরম পানিতে দিয়ে পাঁচ মিনিট চুলায় মাঝারি আঁচে ফুটিয়ে নিয়ে এতে মধু বা লেবুর রস মিশিয়ে গরম বা ঠান্ডা যেভাবে পছন্দ পান করা যায়।  

তিনি খাদ্যপণ্য তৈরির প্রক্রিয়া ও রোজেলার গুরত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার ও মেলার মাধ্যমে জনপ্রিয় করেন। পরবর্তীতে নাটোরের ঔষুধী গ্রামের শহিদুল ইসলাম সহ অনেক উদ্দ্যক্তা তৈরী হয়। বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, ইস্টাগ্রাম) এবং টিভিতে বিজ্ঞাপন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

রোজেলা বা চুকুর একটি বহুমুখী ভেষজ উদ্ভিদ, যার কাণ্ড, পাতা ও ফুলে প্রচুর ঔষধি গুণাবলী রয়েছে। এটি শুধু খাদ্য ও পানীয় হিসেবে নয় প্রাচীনকাল থেকেই লোকজ ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রোজেলা ফুলে প্রচুর বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান রয়েছে, যেমন অ্যান্থোসায়ানিন, ফেনলিক যৌগ, অর্গানিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড, ভিটামিন সি এবং প্রোটোক্যাটেচুইক অ্যাসিড—যেগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও কার্ডিওপ্রোটেকটিভ কার্যকারিতা প্রদর্শন করে । বৈজ্ঞানিক ভাবে রোজেলা ক্যালিক্স থেকে  চা বা পানীয় সহ জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, রোজেলি স্বত্ত্ব, জুস তৈরির গবেষণা বিজেআরআই এর ফাইবার কোয়ালিটি ইম্প্রুভমেন্ট বিভাগের পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখার বিজ্ঞানীগণ নিরলস ভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। চুকুরের পাতার বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান এবং পোল্ট্রির খাবারে ফিড এডিটিভস হিসাবে ব্যবহার -এর গবেষণার কাজও আমরা শুরু করেছি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে। রোজেলি চা যেমন মূল্যবান তেমনি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ৷ এই চা পানে ডায়াবেটিস, হৃদরোগের ঝুঁকি ও ওজন কমাতে সাহায্য করে৷ এই চা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা ক্যান্সার প্রতিরোধ, কোষের বার্ধক্য বিলম্বিত করা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। শুধু তাই নয় এতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি  থাকায় রোজেলি চা বিভিন্ন ধরনের ব্যথা প্রশমন করে। রোজেলা চা শুধু একটি পানীয় নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ। এর টক-মিষ্টি স্বাদ নতুন দিনের সতেজতা এনে দেয়, আর এর বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান শরীরকে ভেতর থেকে সুরক্ষা দেয়।


লেখক : উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্ট হার্ভেস্ট প্রসেসিং শাখা, ফাইবার কোয়ালিটি ইম্পুভমেন্ট বিভাগ, বিজেআরআই।


আমার বার্তা/ড. মোছাঃ ফারহানা শারমিন/এমই