শিশু সুরক্ষায় ব্যর্থতা: মেটার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়, জরিমানা ৯৪২ মিলিয়ন ডলার
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

শিশুদের জন্য ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ নিজেদের প্ল্যাটফর্ম যে ঝুঁকি তৈরি করেছে, সে বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম বড় রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত।
নিউ মেক্সিকোর একজন বিচারক কোম্পানিটিকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে একই মামলায় ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে শিশু সুরক্ষা–সংক্রান্ত এ মামলায় মেটার মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবার নিউ মেক্সিকোর একজন মার্কিন বিচারক মেটাকে আরও ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার (৪২১ মিলিয়ন পাউন্ড) পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিশুদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্মগুলো যে বিপদ তৈরি করেছিল, সে সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থতার জন্য এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা শিশু সুরক্ষা–সংক্রান্ত মামলায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রায়।
বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড বলেছেন, এই সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টটি বায়ু দূষণের মতো একটি "জনসাধারণের জন্য উপদ্রব" (Public Nuisance)। ভবিষ্যতে ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে একটি তহবিলে এই অর্থ জমা রাখতে হবে।
এই রায়ের পাশাপাশি, একই মামলায় এর আগে মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার।
বিচারক বিডশেইড মেটাকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যার পণ্য হলো বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট, আর "শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হলো সেই দূষণ, যা অবশ্যই প্রশমিত করতে হবে"।
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডসের মালিক মেটার একজন মুখপাত্র বৃহস্পতিবার বলেন, "আমরা এই রায়ের সঙ্গে একমত নই এবং আপিল করব।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে মানুষকে নিরাপদ রাখতে কঠোর পরিশ্রম করি এবং খারাপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ থেকেছি। অনলাইনে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় আমাদের রেকর্ডের ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী এবং তথ্য বিকৃতকারী দাবির বিরুদ্ধে আমরা নিজেদের রক্ষা করে যাব।"
এই মামলায় আগের ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের রায়ের বিরুদ্ধেও আপিলের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল মেটা। একই সঙ্গে তারা একই ধরনের ব্যাখ্যাও দিয়েছিল। এই প্রথম কোনো অঙ্গরাজ্য শিশু সুরক্ষা–সংক্রান্ত বিষয়ে মেটার বিরুদ্ধে সফলভাবে মামলা করেছিল।
মেটা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের বিষয় নিয়ে হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি। নিউ মেক্সিকোর রায়গুলোর পাশাপাশি, চলতি বছরের শুরুতে লস অ্যাঞ্জেলেসেও একই ধরনের দাবিতে করা একটি মামলায় হেরে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
নিউ মেক্সিকোর এই মামলাটি ২০২৩ সালে রাজ্যটির আইনজীবীদের দায়ের করা একটি মামলার ভিত্তিতে শুরু হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের বিপন্ন করেছে এবং তাদের যৌন উত্তেজক সামগ্রী ও যৌন শিকারীদের সংস্পর্শে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করা উচিত।
বিচারের প্রথম পর্বে মেটাকে নিউ মেক্সিকোর 'অন্যায় অনুশীলন আইন' (Unfair Practices Act) বারবার লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত বলেন, মেটার সুপারিশ অ্যালগরিদম মূলত তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর বিষয়বস্তু ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্পর্শের দিকে "চালিত" করেছে।
সুপারিশ অ্যালগরিদম হলো সেই প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে মেটা তার প্ল্যাটফর্মে একজন ব্যবহারকারী কী ধরনের কনটেন্ট দেখবেন, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করে।
বিচারের দ্বিতীয় পর্বে বিচারক বিডশেইড রায় দেন, মেটার কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি "জনসাধারণের উপদ্রব" পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার এমন একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিশু সুরক্ষা–সংক্রান্ত বিষয়ে মেটার বিরুদ্ধে এটিই সবচেয়ে বড় আর্থিক জরিমানা। একই সঙ্গে, এটিই সম্ভবত প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে "জনসাধারণের উপদ্রব" হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
রায়ে বিচারক লিখেছেন, ঠিক যেমন কারখানা থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত দূষণ মানুষের বিশুদ্ধ বাতাস পাওয়ার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষতিকর প্রভাবও শিশুদের ওপর শুধু এর প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সমগ্র ইন্টারনেটে এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, তাদের পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর একটি সাধারণ সামাজিক বোঝা তৈরি হয়।
বিচারক বলেন, মেটাকে যে তহবিল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা "ক্ষতির ব্যাপক প্রভাব" প্রশমিত করার কাজে ব্যয় করা হবে।
আদেশ অনুযায়ী, মোট ৪২০ মিলিয়ন ডলারের এই অর্থের সিংহভাগ মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে ইতোমধ্যে সৃষ্ট ক্ষতির চিকিৎসায় ব্যয় হবে। এর মাধ্যমে উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল ও অন্যান্য আচরণগত স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের অর্থায়ন করা হবে।
অর্থের আরেকটি অংশ সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে শিক্ষক এবং স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য শিশুদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণও থাকবে।
এছাড়াও, মেটাকে নিম্নলিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য "লাইক" গণনা বন্ধ করা,
এই ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতিদিন রাত ১০:০০টা থেকে সকাল ৭:০০টা পর্যন্ত এবং সাধারণ স্কুল চলাকালীন সময়ে সকাল ৮:০০টা থেকে দুপুর ৩:০০টা পর্যন্ত (সপ্তাহান্ত ব্যতীত) পুশ নোটিফিকেশন নিষিদ্ধ কর্
এই ধরনের ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুক জুড়ে প্রতি মাসে মোট ৯০ ঘণ্টা, বা প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টার একটি বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সীমা কার্যকর করা।
আগামী সপ্তাহে, ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় মামলা শুরু হবে। প্রায় তিন ডজন মার্কিন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা শিশু গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের জন্য সংস্থাটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
