মরক্কোর নেতৃত্বে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ
রানা এস এম সোহেল

মরক্কোতে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর দীর্ঘ আলোচনা ও জোট সমঝোতা শেষে গত ১৬ অক্টোবর ২০২৬ রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ রাবাতের রাজপ্রাসাদে নতুন সরকারের সদস্যদের নিয়োগ দেন। নতুন সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী সরকারপ্রধান ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি। ৩২ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় সাতজন নারী রয়েছেন।
নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত মন্ত্রণালয়গুলোর বেশ কয়েকটিতে পুরনো ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের উপর আস্থা রেখে তাদের স্ব-স্ব পদে বহাল রাখা হয়েছে। আবদেলওয়াফি লাফতিত কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্বে পুনর্বহাল করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। বিগত সময়ে তার সাফল্যের বিষয়টি বিবেচনা করে তাকে এ পদে বহাল রাখা হয়।
মরক্কোর জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেজন্য পররাষ্ট্রনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। নাসের বুরিতা পুনরায় পররাষ্ট্র, আফ্রিকান সহযোগিতা ও মরক্কোর প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিদেশে বসবাসরত মরক্কোর নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা তাঁর প্রধান দায়িত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক তৎপরতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।
এছাড়াও আবদেলতিফ ওয়াহবি বিচারমন্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। বিচারব্যবস্থার সংস্কার, আইনগত কাঠামো আধুনিকীকরণ এবং বিচারিক প্রশাসন তাঁর মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব। একইভাবে আহমেদ তৌফিক ধর্মীয় বিষয় ও ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে থাকবে।
নতুন সরকারের অন্যতম আলোচিত নিয়োগ মনে করা হচ্ছে ফৌজি লেকজার নিযুক্ত হওয়াকে। মরক্কোর ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ও সাবেক বাজেটমন্ত্রী লেকজা অর্থনীতি, অর্থ ও সরকারি কর্মদক্ষতা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। বাজেট ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থনীতি, আর্থিক নীতি এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো হবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতির সঙ্গেও তাঁর দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজার বারাকা সরঞ্জাম, পানি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। পানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো ও বনসম্পদ সংরক্ষণে তাঁর মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নাবিল বেনআব্দাল্লাহ জাতীয় শিক্ষা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো তাঁর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব পেয়েছেন ইউনেস বিজিজু, আর কৃষি, সামুদ্রিক মৎস্য ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন খালিদ হাতিমি। খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হবে।
শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দায়িত্বে রয়েছেন রিয়াদ মেজ্জুর। অন্যদিকে যুব, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ মাহদি বেনসাইদ। উচ্চশিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের দায়িত্বে রয়েছেন আজেদ্দিন এল মিদাউই এবং পরিবহন ও লজিস্টিকসের দায়িত্ব পেয়েছেন আব্দেসসামাদ কায়ুহ।
নতুন সরকারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্ভাবনগুলোর একটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে পৃথক মন্ত্রণালয়। আহমেদ রাহহু এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। ডিজিটাল সরকারি সেবা সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা হবে তাঁর প্রধান কাজ।
এ ছাড়া শারাফাত আফাইলাল জ্বালানি, খনিজ ও টেকসই উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খনিজসম্পদ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন তাঁর মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নাজওয়া কুকুস পরিবার, সামাজিক উন্নয়ন ও সমতা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে একদিকে তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করতে হবে; অন্যদিকে ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য বিশাল অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কর্মসূচি সফল করতে হবে। নতুন সরকারের সামনে তাই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কার, সামাজিক উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মরক্কোর অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বিশাল দায়িত্ব রয়েছে।
