যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকো: এক শিশুর হাত ধরে যেভাবে ছড়াল প্রাণঘাতী হাম

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১১:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

ঘটনার শুরু গত বছরের শুরুর দিকে। মেক্সিকোর নয় বছর বয়সী এক শিশু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সেমিনোল এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। মেক্সিকোর চিয়ুয়াহুয়ায় নিজের বাড়িতে ফেরার কিছুদিন পরই শিশুটির শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার সহপাঠীদের বড় একটি অংশ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্কুলটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

শিশুটির পরিবার জানত না যে, তাদের সফরের সময়ই টেক্সাসের ওই শহরটিতে অলক্ষ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছিল। দেখতে দেখতে সেমিনোল শহরটি গত ৩০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যেখানে তিন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়। কিন্তু ভাইরাসটি যখন সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকোয় প্রবেশ করে, তখন এক চরম ট্র্যাজেডির সূত্রপাত ঘটে।

মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে হামের জটিলতায় অন্তত ৪০ জন মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে যেমন রয়েছে কোলের শিশু, তেমনি রয়েছেন মধ্যবয়সী খামারশ্রমিকও। এই সময়ে মেক্সিকোয় ১৭ হাজারের বেশি মানুষের অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যা প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চারগুণ বেশি। সাধারণত মাত্র দুটি টিকার মাধ্যমেই এই রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই টিকা নেওয়া ছিল না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেক্সিকোর এই বর্তমান পরিস্থিতি একটি দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য উদাসীনতা বা ঘাটতি থাকলে কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

কানাডা থেকে মেক্সিকো: ভাইরাসের গতিপথ

টেক্সাস সীমান্তের দক্ষিণে মেক্সিকোর চিয়ুয়াহুয়া রাজ্যের আপেল, গম ও ভুট্টা চাষি ‘মেনোনাইট’ (এক বিশেষ খ্রিস্টান ধর্মীয় গোষ্ঠী) সম্প্রদায়ের একটি এলাকায় প্রথম এই রোগ ছড়ায়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে মৌসুমি আদিবাসী খামারশ্রমিকদের মধ্যে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শুধু এই রাজ্যেই সাড়ে চার হাজার রোগী শনাক্ত হয়, যা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মোট আক্রান্তের চেয়েও বেশি।

আণুবীক্ষণিক এই ভাইরাসের গতিপথ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হলেও মেক্সিকোর ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের শরীর থেকে নেওয়া ১০০রও বেশি নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্য হুবহু মিলে গেছে ২০২৪ সালে কানাডায় এবং পরবর্তীতে টেক্সাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের ধরনের সঙ্গে। মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহামারি তথ্য শাখার পরিচালক ড. মিগুয়েল নাকামুরা বলেন, পুরো দেশের সংক্রমণের উৎস আসলে চিয়ুয়াহুয়ার ওই প্রাদুর্ভাব।

করোনার চেয়েও ছোঁয়াচে

চিকিৎসকদের মতে, হাম বিশ্বের অন্যতম তীব্র ছোঁয়াচে রোগ, যা করোনাভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা সামান্য কথা বলার মাধ্যমেও এটি বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন।

মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটির মহামারির অধ্যাপক স্যামুয়েল পনস দে লিওন বলেন, টিকার সাফল্যের কারণেই কয়েক দশক ধরে মানুষ পোলিও বা হামের মতো রোগের ভয়াবহ জটিলতা দেখেনি। মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই প্রায় ২৫ বছর আগে হামমুক্ত হয়েছিল। আর রোগটি দেখা যেত না বলেই মানুষ উদাসীন হয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল—আমাদের কেন অযথা টিকার চিন্তা করতে হবে?

সেমিনোলের মতো টেক্সাসের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাবিরোধী নানা অপপ্রচার ছড়ায়। অন্যদিকে মেক্সিকোয় সমস্যাটি ছিল সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা এবং বাজেটের অভাব। সরকারের উদাসীনতায় গত কয়েক বছরে টিকাদানের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। চিয়ুয়াহুয়া অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. হুগো কোভিয়ান জানান, কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ না পাওয়ায় তারা সময়মতো সব শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

মৃত্যুর পর টনক নড়ল

চিয়ুয়াহুয়ার কুয়াউতেমক শহরের ‘এসপেরানজা’ মেনোনাইট স্কুলের প্রধান শিক্ষক অস্কার পিটার্স জানান, শুরুতে স্থানীয় চিকিৎসকেরা এটিকে সাধারণ বিষয় বলে উড়িয়ে দিলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্কুলের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। মেনোনাইটদের খামারে কাজ করতে আসা দরিদ্র ও পুষ্টিহীন আদিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়ানোর পর পরিস্থিতি নাজুক হয়ে ওঠে। জুনের শুরুতে চার বছরের এক আদিবাসী শিশুসহ চিয়ুয়াহুয়ায় ২১ জন মারা যান, যাদের ১৭ জনই ছিলেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একজন আন্দ্রেস বার্গেন। তার চার সন্তানই হামে আক্রান্ত হয়ে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে ভুগে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। বার্গেন বলেন, ‘আগে ভাবতাম হাম আমাদের দাদা-দাদিদের আমলের রোগ, এখন আর এসব নেই। কোভিডের পর থেকে চিকিৎসকদের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল বলেই সন্তানদের টিকা দেইনি।’

অনেক অভিভাবক শিশুদের প্রাকৃতিকভাবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরির জন্য ইচ্ছা করে আক্রান্ত করানোর মতো বিপজ্জনক পরামর্শও দিয়েছিলেন বলে জানান প্রধান শিক্ষক পিটার্স।

জরুরি পদক্ষেপে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মেক্সিকোর স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। মেনোনাইটদের নিজস্ব ভাষা ‘লো জার্মান’-এ সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হয়। চিয়ুয়াহুয়া রাজ্যের প্রায় অর্ধেক মানুষকে টিকার আওতায় আনা হয়।

তবে চলতি বছরের শুরুতে এই প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রবিন্দু আরও দক্ষিণে মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও কৃষি অঞ্চল জলিস্কো রাজ্যে স্থানান্তরিত হয়। সংক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে, রাজ্যের রাজধানী গুয়াদালাজারার স্কুল-কলেজে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর গুয়াদালাজারা। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে মেক্সিকোজুড়ে রেকর্ড ২৫ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। ব্যাপক টিকাদানের ফলে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেই বর্তমানে সংক্রমণের গ্রাফ অনেকটাই নিম্নমুখী।

জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম মস অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা মেক্সিকোর হামের হুমকি এখনই শেষ হয়ে গেছে—তা বলা যাচ্ছে না। কারণ দুই দেশেই এমন বহু অনাক্রান্ত গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা টিকা নেননি। যে কোনো সময় একজন আক্রান্ত যাত্রী সেখানে পৌঁছালেই আবার বারুদ জ্বলে উঠতে পারে।’ - সূত্র: সিএনএন