সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের উদ্যোগে ঢাকায় প্রদর্শিত হল `অ্যামিবা’
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৪:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ
রানা এস এম সোহেল

৩৭ তম সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই ) সন্ধ্যায় ঢাকার একটি সিনেপ্লেক্সে এক বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ঢাকায় অবস্থিত সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের উদ্যোগে এবং চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি’র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
এতে তান সিইউ পরিচালিত “অ্যামিবা”চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হয়। এটি সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত একটি সিঙ্গাপুরীয় বয়ঃসন্ধিকালীন চলচ্চিত্র। এর কাহিনী মূলত ১৬ বছর বয়সী এক স্কুল ড্রপ আউট কিশোরীকে কেন্দ্র করে, যে তার অভিজাত বালিকা বিদ্যালয়ের তিনজন বেমানান বান্ধবীর সাথে একটি গোপন দল গঠন করে এবং সিঙ্গাপুরে প্রচলিত রীতিনীতি মেনে চলার চাপকে তুলে ধরে।
বিশ্লেষণঃ
'অ্যামিবা' হলো সিঙ্গাপুরের কঠোর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার পটভূমিতে তৈরি একটি অসাধারণ কামিং-অফ-এজ (coming-of-age) বা বয়ঃসন্ধিকালের গল্প। সিনেমার মূল চরিত্র ১৬ বছর বয়সী স্কুল ড্রপআউট ছু শিন ইউ (রেনিস টে)। সে যখন সিঙ্গাপুরের এক নম্বর ও ঐতিহ্যবাহী ‘কনফুসিয়াস গার্লস সেকেন্ডারি স্কুল’-এ পুনরায় ভর্তি হয়, তখন চারপাশের কঠোর নিয়মকানুনের সাথে নিজেকে মেলাতে পারে না। এই দমবন্ধ পরিবেশে সে পাশে পায় আরও তিনজন সমমনা কিশোরীকে—সাঁতারু ভ্যানেসা, ধনী পরিবারের মেয়ে সোফিয়া এবং হাসিখুশি জিনা। স্কুলের কড়া নিয়ম আর কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে তারা নিজেদের একটি অনানুষ্ঠানিক "গার্ল গ্যাং" বা মেয়েদের দল তৈরি করে। সোফিয়ার পারিবারিক গাড়ির চালক আঙ্কেল ফুনের (জ্যাক কাও) কাছ থেকে তারা পুরোনো দিনের গ্যাংস্টারদের গল্প শোনে এবং হ্যান্ডহেল্ড ক্যামকর্ডারে নিজেদের বিদ্রোহী মুহূর্তগুলো ধারণ করতে শুরু করে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের মতো একটি সুশৃঙ্খল দেশে, যেখানে চুইংগাম পর্যন্ত নিষিদ্ধ, সেখানে এই কিশোরীদের অবুঝ বিদ্রোহ তাদের জীবনকে কোন সংকটে ফেলে—তা নিয়েই এগিয়েছে ছবির গল্প।
শক্তিশালী দিকঃ
বাস্তবধর্মী চিত্রনাট্য ও পরিচালনা এই ছবির মূল শক্তি। পরিচালক হিসেবে তান সিউ-এর এটি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলেও তিনি সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থার চাপ এবং কিশোরী বয়সের মানসিক টানাপোড়েনকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। স্কুলের অ্যাসেম্বলি, ইউনিফর্মের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা বা ব্রার রঙ চেক করার মতো কঠোর নিয়মগুলো সিনেমার আবহকে বেশ জীবন্ত করেছে।
কাস্টের চমৎকার রসায়ন ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম হয়েছে। মূল চার কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রীদের অন-স্ক্রিন রসায়ন ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে রেনিস টে-এর ক্ষ্যাপাটে অথচ আবেগপ্রবণ অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। প্রবীণ অভিনেতা জ্যাক কাও আঙ্কেল ফুনের চরিত্রে সিনেমাটিতে একটি ভিন্ন মাত্রা ও হাস্যরসের জোগান দিয়েছেন।
ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক গভীরতাও বেশ ভালো পরিলক্ষিত হয়েছে। সিনেমায় পাত্র-পাত্রীদের ‘সিংলিশ’ (Singlish) এবং ইংরেজি-চাইনিজ ভাষার মিশ্রণে কথা বলার স্বাভাবিক ধরণটি সিঙ্গাপুরের আসল সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। এটি কোনো কৃত্রিম হলিউড ঘরানার সিনেমা নয়, বরং মাটির কাছাকাছি থাকা একটি গল্প।
তবে কিছুটা মন্থর গতি ও দুর্বল সাবপ্লট ও মনে হতে পারে। ৯৮ মিনিটের এই সিনেমাটির গতি মাঝে মাঝে কিছুটা মন্থর মনে হতে পারে। এছাড়া মূল চরিত্রের ঘরে ভূতের উপস্থিতি বা কিছু অলৌকিক উপাদান (supernatural subplots) গল্পে যুক্ত করা হয়েছে, যা সামাজিক বার্তার সাথে পুরোপুরি খাপ খায়নি এবং দর্শকদের মূল প্লট থেকে কিছুটা বিভ্রান্ত করতে পারে। এছাড়াও সিনেমার শেষ অংশটি কিছুটা রূপক এবং অস্পষ্ট (ambiguous ending), যা হয়তো সাধারণ বিনোদনপ্রেমী দর্শকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারবে না।
তবে সামগ্রিকভাবে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করলে বোঝা যায় যে, 'অ্যামিবা' কোনো প্রথাগত অ্যাকশন বা মেলোড্রামাটিক সিনেমা নয়; এটি হলো সিঙ্গাপুরের চকচকে আধুনিকতার পেছনে লুকিয়ে থাকা কিশোর/তরুণ প্রজন্মের এক নীরব প্রতিবাদের গল্প। অ্যামিবা যেমন নিজের আকার পরিবর্তন করে টিকে থাকে, এই চার কিশোরীও তেমনি কঠোর নিয়মের মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
সিনেমাটি ইতিমধ্যে টরন্টো ও বুসান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়েছে এবং এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডস (অস্ট্রেলিয়া)-এ শ্রেষ্ঠ যুব চলচ্চিত্র, গোল্ডেন হর্স অ্যাওয়ার্ডস (তাইওয়ান)-এ ফিপরেস্কি পুরস্কার (আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ফেডারেশন কর্তৃক প্রদত্ত), হংকং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ পরিচালক, পিংইয়াও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (চীন)-এ যুব জুরি পুরস্কার এবং সিনেফিলিয়া সমালোচক পুরস্কার। ইত্যদি বেশ কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে।
যারা একটু ভিন্নধারার, মনস্তাত্ত্বিক এবং বাস্তবঘেঁষা সিনেমা পছন্দ করেন, তাদের জন্য 'অ্যামিবা' একটি অবশ্যই দেখার মতো চলচ্চিত্র।
আমার বার্তা /জেএইচ
