মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি কমতে পারে ১.২ শতাংশ

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০৬ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে। ফলে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। দেশের রপ্তানি ২ শতাংশ ও আমদানি ১.৫ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়বে, ফলে প্রকৃত মজুরি কমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি উৎপাদন, তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল এবং আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর।

জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে কাতার এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করায় সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ এলএনজি আমদানি কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বর্তমানে কার্যত অচল। এর ফলে দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।

সানেম তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তিনটি প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে প্রভাবিত করছে—জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা। এর মধ্যে জ্বালানি চ্যানেলটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে তেল ও গ্যাসের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়াবে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করবে, চলতি হিসাবের ঘাটতি বিস্তৃত করবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র করবে।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য সানেম ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’র কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম (CGE) মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন পরিস্থিতি সিমুলেট করেছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এক্ষেত্রে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যেখানে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমে গিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক (RMG) খাতের উৎপাদন প্রায় ১.৫ শতাংশ কমতে পারে। পরিবহন খাতে প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি খাতে প্রায় ১ শতাংশ উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া জ্বালানি-নিবিড় শিল্প খাতে উৎপাদন প্রায় ২.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে, যা সামগ্রিক শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকার এরই মধ্যে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের মতো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এসব পদক্ষেপে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সানেম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে।

সানেমের সুপারিশগুলো হলো—

প্রথমত, জমি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সহজলভ্য ও কার্যকর খাতগুলোর দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। নেট-মিটারিং প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিয়ে বাণিজ্যিক ও শিল্পখাতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ জরুরি।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে জাতীয় বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো যায়।

তৃতীয়ত, করমুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম এবং স্বল্প সুদের ঋণসহ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করে নতুন সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তর করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজি আমদানির জন্য বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে।

পঞ্চমত, ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও পরিশোধিত জ্বালানির একটি কৌশলগত জাতীয় মজুত গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ষষ্ঠত, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল ফুয়েল পাসের মাধ্যমে জ্বালানি রেশনিং কার্যকর করা, শিল্পখাতের উৎপাদন সময়সূচি অফ-পিক সময়ে স্থানান্তর করা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়সীমা সীমিত করা যেতে পারে, যাতে সীমিত জ্বালানি অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

সবশেষে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম—স্থলভাগ ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই ত্বরান্বিত করা জরুরি, যাতে নির্ভরযোগ্য বেইসলাইন বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পায়।


আমার বার্তা/এমই