নরসিংদী জেল পালানো জঙ্গি ‘জুয়েল ওস্তাদ’ বোমাসহ গ্রেপ্তার
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৯ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া থেকে দুইটি হাতে তৈরি বোমাসহ জুয়েল ভূঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, জুয়েল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য সন্দেহে আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং নব্য জেএমবির আলোচিত বোমার কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনা এবং পুলিশের ওপর জঙ্গি হামলার তদন্তের সূত্র ধরে ডেমরার সারুলিয়া এলাকার পশ্চিম নিঝুমবাগ থেকে জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর হেফাজত থেকে দুটি হাতে তৈরি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহসিন মাসুদ বলেন, বোমারু মামুনের সহযোগী হিসেবে সন্দেহভাজন জুয়েল ওই এলাকায় অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) যৌথভাবে অভিযান চালায়। অভিযানে দুটি হাতে তৈরি বোমা উদ্ধার করা হয়েছে এবং একজনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, জুয়েল যে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, পরে সেটি ঘিরে তল্লাশি চালানো হয়। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে তল্লাশি শেষে উদ্ধার হওয়া দুটি বোমা নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জুয়েল ভূঁইয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেন।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য সন্দেহে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ জুয়েল ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার মধ্যে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা কারাগারের ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন সেলের তালা ভেঙে দিলে ৯ জঙ্গিসহ ৮২৬ বন্দি পালিয়ে যান। এ সময় কারাগারের অস্ত্রাগার ও কারারক্ষীদের কাছ থেকে ৮৫টি অস্ত্র এবং ৮ হাজার ১৫০টি গুলি লুট করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, পালিয়ে যাওয়া নয় জঙ্গির মধ্যে জুয়েল ভূঁইয়াও ছিলেন। ছয় দিন পর ২৫ জুলাই নরসিংদী জেলা পুলিশের হাতে আবার গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে তাঁকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেই নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। সরকার পতনের পর সেপ্টেম্বরের দিকে মামুনসহ অন্যদের সঙ্গে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন জুয়েল।
জঙ্গি নেটওয়ার্কে জুয়েলের কোডনেম ‘ওস্তাদ’ বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কাজীরচর এলাকায়।
পুলিশ বলছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের মধ্যে যারা পরবর্তী সময়ে আবার সংগঠিত হয়েছে, তাদের বিষয়ে নজরদারি ও তদন্ত চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় বোমারু মামুন ও তাঁর সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তল্লাশির সময় পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে বোমাভর্তি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। মার্চে কুমিল্লার একটি শিবমন্দিরে বিস্ফোরণ এবং একই মাসে রাজধানীর সায়েদাবাদে পুলিশের তল্লাশির সময় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাতেও বোমারু মামুন ও তাঁর সহযোগী আরিফ ওরফে ইমরানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের দাবি, এসব ঘটনার তদন্তে বোমারু মামুনকে নব্য জেএমবির অন্যতম প্রধান বোমার কারিগর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর অন্যতম সহযোগী আরিফ ওরফে ইমরানকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামুন এখনো পলাতক।
সবশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাভারের শ্যামপুরে বোমারু মামুনের অন্যতম সহযোগী আরিফকে গ্রেপ্তারের পর দক্ষিণ শ্যামপুরে তাঁর আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। সন্ধ্যা থেকে বাড়িটি ঘিরে রেখে রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত অভিযান চলে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ পাইপ বোমা, বোমা তৈরির রাসায়নিক ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
এর পরদিন সাভারের ভারের গোপেরবাড়ি লালটেক এলাকার ঘোড়া মসজিদের সামনে একটি মাঠে পড়ে থাকা আরেকটি ‘প্রেশার কুকার’ বোমা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। পরে সেটিও নিষ্ক্রিয় করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবেই রোববার ডেমরার সারুলিয়া থেকে জুয়েল ভূঁইয়া ওরফে ‘ওস্তাদকে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া দুই হাতবোমা নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
